শনিবার   ১১ জুলাই ২০২৬   আষাঢ় ২৬ ১৪৩৩   ২৫ মুহররম ১৪৪৮

বাংলাদেশকে ঘিরে আধিপত্যের লড়াই

মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:৪৫ এএম, ১১ জুলাই ২০২৬ শনিবার


 
আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তিগুলো লড়াইয়ের ক্ষেত্র হিসাবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে। এই লড়াইটা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। তবে সাম্প্রতিককালে তা অনেক বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। ঢাকায় একটি সেমিনারে সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মিরের মানচিত্র ঘিরে উত্তাপ ছড়িয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সংস্থা ‘সাউথ এশিয়ান এসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশন’ (সার্ক) বিষয়ে ‘বাংলাদেশ ইন্সষ্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিস’ (বিস) আয়োজিত এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত আহমেদ তারিক করিম। প্রবন্ধটি উপস্থাপনের পাশাপাশি প্রজেক্টরে মানচিত্র দেখানো হচ্ছিল। ওই সময় দর্শক সারি থেকে ভারতীয় হাই কমিশনের এক নারী কূটনীতিক বলেন যে, ‘মানচিত্রটি সঠিক নয়। জম্মু ও কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ’। এ সময় তারিক করিম বলেন, ‘এই মানচিত্র একটি প্রতীকী ব্যাপার; প্রকৃত সীমানারেখা নয়’। ওই নারী কূটনীতিক তখন বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু মানচিত্রে ভুল আছে। জম্মু ও কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিষয়টা আমি উল্লেখ করলাম’। তারিক করিম বলেন, ‘আপনি কি ভারতীয় ?’ জবাবে নারী কূটনীতিক বলেন, ‘আমার নাম পূজা ঝা। আমি ভারতীয় হাই কমিশনের দ্বিতীয় সচিব’। এ সময় তারিক করিম বলেন, ‘আপনার পয়েন্টটি নোট করা হলো’। তারপর তারিক করিম আবার মূল প্রবন্ধ থেকে পাঠ করতে থাকেন। এ সময় সেমিনারে উপস্থিত পাকিস্তানের ডেপুটি হাই কমিশনার বলতে থাকেন যে, ‘এই বিষয়ে আমার কথা আছে’। তারেক করিম বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আপনারা এখনই কথা বলতে থাকলে আলোচনা শেষ করা যাবে না’। তখন বিষয়টি নিয়ে আর কোনও উচ্চবাচ্য করেনি কেউ।
কাশ্মিরের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে বাংলাদেশ সাধারণত নিজেকে দূরে রাখে। বাংলাদেশ মনে করে, কাশ্মির ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় এবং কাশ্মিরের জনগণের ইস্যু। ফলে একটি আঞ্চলিক সেমিনারে প্রতীকী হলেও মানচিত্রের বিতর্ক এড়িয়েও তারেক করিমের মতো অভিজ্ঞ কূটনীতিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে পারতেন বলে ধারণা করা যায়। তবে ঢাকায় দ্বিপক্ষীয় লড়াইয়ের ক্ষেত্র হিসাবে ভারত ও পাকিস্তান আরও অনেকভাবে তৎপরতায় লিপ্ত। শাসনকাল ভেদে এই দুই চিরশত্রু বাংলাদেশে নিজেদের আধিপত্যের লড়াই করে থাকে। শেখ হাসিনার আমলে ভারতের আধিপত্য বেশি ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভ্যূত্থানের ফলে ওই বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে ‘রিসেট’ হতে শুরু করে। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ছন্দপতন ঘটে। এই ঘটনাকে তাই অনেকে ভারতবিরোধী জনগোষ্ঠীর জন্যে স্বর্ণযুগ মনে করতে থাকে। বাংলাদেশে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তিগুলো বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে ঘিরে তাই অনেক আলোচনা ও সমালোচনা চলতে থাকে। একটা প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, বাংলাদেশ কি চীনমুখি হয়ে গেলো ?
বাংলাদেশের কোনও প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর এটাই প্রথম নয়। এর আগে বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাও চীনকে প্রথম সফর হিসাবে বেছে নিয়েছেন। তবে এবারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর প্রকাশিত যৌথ ইশতেহারে অনেক বেশি বাঁকবদল চোখে পড়ে। বিশেষ করে টু প্লাস টু সংলাপের সিদ্ধান্ত থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে, সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের চীন নির্ভরতা রয়ে গেছে। আরেকটি বিষয় এবারের সফরে খুব আলোচিত হচ্ছে। সেটি হলো, চীন, মিয়ানমার, বাংলাদেশ করিডোর। এই করিডোর হবে মাল্টিমুডাল অর্থাৎ সমুদ্রপথ ও সড়কপথ ব্যবহার করে চীন ও বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। চীনের কুনমিং থেকে পণ্য সড়কপথে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন কিংবা চাকতো সমুদ্র বন্দরে পৌঁছলে সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে বিসিআইএম নামের একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা ডালপালা মেলেছিল। মোটরযানের মাধ্যমে কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে কুনমিং পর্যন্ত ট্রায়াল রানও হয়েছে। কিন্তু ভারত এই সহযোগিতায় তেমন আগ্রহ দেখায়নি। ফলে এই সহযোগিতা মুখথুবড়ে পড়েছে। এখন চীনের বাণিজ্যিক পণ্য সহজেই বঙ্গপোসাগর দিয়ে বাংলাদেশে আসাটাকে এক ধাপ অগ্রগতি বিবেচনা করা যায়। এতেই নড়েচড়ে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ঢাকায় মার্কিন একজন কূটনীতিক ‘আজকাল’কে বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সম্পর্ক আছে সেটা যুক্তরাষ্ট্র জানে। তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব উপায়ে সম্পর্কের বলয় সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের পার্লামেন্টে যুক্তরাষ্ট্র একটি ককাস তৈরী করেছে। সাবেক মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুককে প্রধান করে এই ককাস গড়ে তোলা হয়। এতে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের প্রতিনিধি আছেন। এই ককাসের আয়োজনে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপিত হয়। এই অনুষ্ঠানে ডেপুটি স্পীকার ব্যারিষ্টার কায়সার কামাল প্রধান অতিথি ছিলেন। অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের অনিন্দ্য সুন্দর স্থাপত্যকলা সংসদ ভবনের নকশা তৈরী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আর্কিট্যাক্ট লুই কান। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অবস্থিত উইলিস টাওয়ার যা সাবেক সিয়ার্স টাওয়ার নামে পরিচিত ভবনের প্রধান আর্কিট্যাক্ট ছিলেন বাংলাদেশের ফজলুর রহমান খান।