ফের রোহিঙ্গা ঢলের শঙ্কা
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০২:৩৩ এএম, ৫ জুলাই ২০২৬ রোববার
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় আবারও রোহিঙ্গা ঢলের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনে মংডু শহরে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ করে বিমান হামলা চালিয়েছে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী। এসব হামলায় আরাকান আর্মির স্থাপনার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ঘড়বাড়িও ধ্বংস হয়েছে। ফলে রাখাইনের আতঙ্কিত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার খোঁজে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে নতুন রোহিঙ্গা ঢল ঠেকাতে সীমান্তে বাড়তি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাখাইন রাজ্য পুনরুদ্ধারে বুধ ও বৃহস্পতিবার থেমে থেমে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ করে বিমান হামলা চালায় মিয়ানমার সামরিক বাহিনী। হামলার তীব্রতায় কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের বাড়িঘরসহ বিভিন্ন গ্রাম ভূমিকম্পের মতো কেঁপে ওঠে। তবে শুক্রবার মংডু শহরের ভিতরে সংঘর্ষ ঘটলেও এপারে তেমন কোনো বিকট শব্দ শোনা যায়নি। এসব হামলায় আরাকান আর্মির স্থাপনার পাশাপাশি রাখাইনে বসবাসকারী রোহিঙ্গারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা সেখানে নিরাপদবোধ না করলে বাংলাদেশে নতুন করে অনুপ্রবেশের শঙ্কা রয়েছে। এর আগে গত বছর সংঘাতের কারণে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা দেশে অনুপ্রবেশ করেছিল।
উখিয়ার শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা মো. জুবায়ের জানান, মিয়ানমারে জান্তা বাহিনীর ভয়াবহ বিমান হামলায় অসংখ্য ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। একই সময়ে স্থলপথে আরাকান আর্মির সঙ্গে আরও তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর তুমুল সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বহুমুখী এ সংঘর্ষের কারণে রাখাইনের সার্বিক পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র হলে এই বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষ কোনো উপায় না পেয়ে আশ্রয়ের খোঁজে বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। আলীখালী ক্যাম্পের শরণার্থী ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘মংডুতে থাকা এক আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেনেছি, সেখানকার পরিস্থিতি এখন খুবই উত্তপ্ত। সহজে কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। অনেক রোহিঙ্গা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে। এক বছর আগে সংঘাতের সময় ধাপে ধাপে উখিয়া ও টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছিল। আমরা চাই রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গা ভাইয়েরা যেন নিরাপদে থাকতে পারেন।’ রাখাইনে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় কক্সবাজারের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপ সীমান্তের খুব কাছে হওয়ায় এখান থেকে আরাকান আর্মির পোস্টও দেখা যায়। বুধবার দ্বীপের ওপারে রাখাইনে বিস্ফোরণের তীব্রতায় বাড়িঘর ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠেছিল। এ সময় সবার মাঝেই ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।’
উখিয়ার পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘রাখাইনে সংঘাত শুরু হলেই এপারে আতঙ্ক দেখা দেয়। সীমান্তবর্তী গ্রামের বাড়িঘরে গোলাবারুদ এসে পড়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা লেগেই থাকে। গত বছর আরাকান আর্মি-জান্তা সরকারের সংঘাত শুরুর পর লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। আবার সংঘাত শুরু হলে রাখাইনে থাকা অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।’ তবে নতুন রোহিঙ্গা ঢল ঢেকাতে সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘ওপারে বিস্ফোরণের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হলেও সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ লক্ষ্যে টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়া, বরইতলী ও জাদিমোড়া সীমান্ত এলাকায় বিশেষ টহল, নাফ নদে নৌটহল, সীমান্তজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’
