জুলাই নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন
মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ১২:৪৫ এএম, ৪ জুলাই ২০২৬ শনিবার
দুই বছর আগে জুলাই মাসে গোটা বাংলাদেশ ছিল উত্তাল এক তরঙ্গমালা। রক্তাক্ত সেই জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়ন নিয়ে এখন বাংলাদেশের রাজনীতি স্পষ্টত বিভক্ত। সংস্কারের উপায় নিয়ে জুলাই আন্দোলনের পক্ষের দুই বড় দলের পথ রীতিমত পৃথক। ক্ষমতাসীন বিএনপি সংস্কার বাস্তবায়ন করতে সংবিধান সংশোধনের সংসদীয় কমিটি করতে চায়। কিন্তু বিরোধী জামায়াতে ইসলামী বলছে, তারা সংবিধান সংশোধনের কমিটিতে কোনও নাম দেবে না। জামায়াত-এনসিপি চায় সংবিধানের সংস্কার। অনেকটাই নতুন সংবিধান প্রণয়নের মতো। কিন্তু বিএনপি বলছে, এই সংবিধানের অধীনে শপথ নিয়ে গঠিত সংসদ সংবিধান পরিবর্তনেও সাংবিধানি রীতিই অনুসরণ করতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের শুরুতে ২০২৪ সালে প্রথমে ছাত্ররা সরকারি চাকুরীতে কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তা এক দফা তথা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে রুপ নেয়। সেই অভ্যূত্থানে একদা শিক্ষক, অভিভাবক, সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর মত দলগুলোও যোগ দেয়। শেখ হাসিনার ভারতে চলে যাবার মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ওই আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অর্ন্তবর্তি সরকার গঠিত হয়। ওই সরকার শুধু নির্বাচন নয়; বরং রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কার সাধনের লক্ষ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংলাপ পরিচালনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী অধ্যাপক আলী রিয়াজ সংলাপ মধ্যস্থতা করেন। তারা একটি সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরী করেন। সংস্কার প্রস্তাবের অনেক জায়গায় বিএনপি তখন আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু পুরো প্যাকেজকেই গণভোটের মাধ্যমে পাস করানো হয়। অনেকে মনে করেন, সংস্কারের জন্যে গণভোট অপ্রয়োজনীয়। তবে অর্ন্তবর্তি সরকারের কারিগররা মনে করেন, গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় পাওয়ায় এখন সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে সংসদ সদস্যদেরকে সংসদ সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবেও শপথ গ্রহণ করতে হবে। তারপর ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। তবে বিএনপি বলছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু নেই। তাই এই পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ করা অসাংবিধানিক। অপরদিকে, জামায়াত ও এনসিপি সদস্যরা এমপি হিসাবে শপথ গ্রহণের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবেও শপথ নিয়েছেন।
ইউনূসের অর্ন্তবর্তি সরকার নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং তার সকল অঙ্গ সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করেছে। সরকারের এহেন সিদ্ধান্তের আলোকে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। দলের নেত্রী বিদেশে নির্বাসিত থাকায় আওয়ামী লীগের অবস্থা শোচনীয়। কতিপয় ঝটিকা মিছিল ছাড়া কোনও কর্মকান্ড নেই। দেশের ভেতরে থাকা বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা গ্রেফতার, হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নির্বাসিতরা দেশে ফিরতে পারছেন না।
জুলাই আন্দোলনের বিষয়েও নানা ধরনের কথা বার্তা চলছে। আগামী ৫ আগস্ট জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবন গণভবনকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। গণভবন জাদুঘর হয়ে যাওয়ায় এই মূহুর্তে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর কোনও বাসভবন নেই।
জুলাই আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা, নিহত পুলিশের সংখ্যা, ট্রাইব্যুনালে জুলাই মাসে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এসব নিয়ে বিতর্কও চলছে। বিএনপি’র এক সময়ের এমপি নিলুফার চৌধুরী মনি সম্প্রতি একটি টকশোতে বলেছেন, জুলাই আন্দোলন সফল করার পক্ষে সেনাবাহিনীর হাত রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী নামানো হলেও সেনাবাহিনী তার উল্টো কাজ করেছে। তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের কেউ কেউ স্নাইপার শটে মারা গেছেন। এই ধরনের শব্দহীন গুলি কে করেছে তা রহস্যময়। কারণ মিছিল থেকে পড়ে যাওয়া এক যুবক মরার সময়ে আশেপাশে পুলিশ ছিল না। মনির এহেন মন্তব্যে সোস্যাল মিডিয়ায় বিতর্কের ঝড় ওঠে। জুলাই আন্দোলকে কটাক্ষ করে ফেসবুকে পোষ্ট দেওয়ায় সোস্যাল মিডিয়ায় তীব্র আলোচনা সমালোচনার মুখে পড়েছেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী প্রয়াত হুমায়ুন আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। তিনি আওয়ামী লীগ ঘরানার শিল্পী হিসাবে পরিচিত।
বিএনপি নেতাদের ইদানিং মন্তব্যে অনুমান করা যাচ্ছে যে, অর্ন্তবর্তি সরকারের দুরভিসন্ধি ছিলো। সেটা বুঝতে পেরেই তারা নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে অংশ নিয়েছেন। আদতে সংস্কারের জন্যে গণভোটের প্রয়োজন নেই। সংস্কারের জন্যে প্রয়োজন রাজনৈতিক মতৈক্য। অর্ন্তবর্তি সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা হচ্ছে জাতীয় সংসদে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, অর্ন্তবর্তি সরকারের সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। ওই সকল দুর্নীতির বিচার হতে হবে।
জুলাইয়ে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী রাজনৈতিক দল গুলোর নেতাদের বিচার হচ্ছে। শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধের বিচারের দায়ে যে ট্রাইব্যুনাল করেছিলেন সেখানেই এখন খোদ শেখ হাসিনারই বিচার হচ্ছে। একটি মামলার বিচারে শেখ হাসিনার মৃত্যুদন্ড হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করা হবে। অপরদিকে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নেতা হাসানুল হক ইনুকে ট্রাইব্যুনাল ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে। ইনু রায় মেনে নেননি। তিনি ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গনে চিৎকার করে তার বিরুদ্ধে দেয়া রায়কে ফরমায়েশি রায় বলে অভিহিত করেন। গণহত্যা তথা মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে বিচার হওয়া যেমন প্রয়োজন; ঠিক তেমনিভাবে বিচারকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানদন্ডে হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক কিংবা ক্যামেরা ট্রায়াল যাতে না হয় সেই দিকেও লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।
