মঙ্গলবার   ০৯ জুন ২০২৬   জ্যৈষ্ঠ ২৫ ১৪৩৩   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

ঢাকার আতঙ্ক ১৩৮৭ ছিনতাইকারী

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:৫৪ এএম, ৯ জুন ২০২৬ মঙ্গলবার

✦ হটস্পটে একের পর এক ছিনতাই ✦ বাড়ছে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, কড়া বার্তা ✦ মামলা নিতে এখনো অনীহা পুলিশের

ভোরের ঢাকা কিংবা রাতের ঢাকা নয়, প্রকাশ্য দিবালোকের দিনের ঢাকাও ছিনতাইয়ের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। ব্যাংকপাড়া কিংবা বাসার গলি, মার্কেট কিংবা বিনোদনকেন্দ্র সব জায়গায় সুযোগ পেলেই ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে সর্বস্ব। কেউ বাধা দিলে গুলি করতেও দ্বিধা করছে না ছিনতাইকারীরা। এতে রাস্তায় বেরোলেই ছিনতাইয়ের এক অজানা আতঙ্কে পথ চলতে হচ্ছে নগরবাসীকে। সমাজমাধ্যমে প্রায়ই ভাইরাল হচ্ছে ছিনতাইয়ের ভয়াবহ সিসি ক্যামেরা ফুটেজ। সবশেষ মতিঝিলের শাপলা চত্বরে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে এক ব্যবসায়ীর টাকা ও ডলার ছিনিয়ে নেওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। যদিও দুই দিনেও এ ঘটনার কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ডিএমপি সূত্র জানিয়েছেন, মতিঝিলের ঘটনার পর তারবার্তায় ডিএমপি সদও দপ্তর থেকে রাজধানীর প্রতিটি থানায় কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি, টহল, চেকপোস্ট বাড়ানোর পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে জামিনে থাকা দাগি আসামিদের তথ্য সংগ্রহ করে কেউ নতুন করে অপরাধে জড়ালে আইনের আওতায় আনতে বলা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘পুলিশ যে হারে গ্রেপ্তার ও মামলা দিচ্ছে এতে ছিনতাই আর হওয়ারই কথা না। কিন্তু প্রক্রিয়াগত টালবাহানায় জ্যামিতিক হারে ছিনতাইকারী ও ছিনতাইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেননা মামলার বিবরণেই অপরাধীদের জামিন পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ ছিনতাইকারীরা এখন বিভীষিকাময় চক্রের সদস্য হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে অস্ত্র নিয়ে মানুষের সর্বস্ব লুট করছে। সুতরাং মামলা ও জামিনের প্রক্রিয়াগত টালবাহানা বন্ধ না হলে ছিনতাইকারীদের লাগাম টানা যাবে না।’

সক্রিয় ১৩৮৭ ছিনতাইকারী, বেড়েছে দেড় গুণ : বর্তমানে ডিএমপির আট বিভাগে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারী তৎপর রয়েছেন। এর মধ্যে রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, ওয়ারীতে ৩০৮, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ ও উত্তরায় ২৪০ জন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী রয়েছেন। যাদের ৮০ শতাংশই এক থেকে সাতটি মামলার আসামি এবং একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও ছিনতাইয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। প্রতিদিন নতুন মুখও যুক্ত হচ্ছে ছিনতাইয়ে। যারা সুযোগ পেলেই ভয়ংকর হয়ে উঠছেন। অথচ ছয় মাস আগেও রাজধানীতে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা ছিল ৯৮৯। কয়েক মাসের ব্যবধানে ছিনতাইকারীর সংখ্যা প্রায় দেড় গুণ বেড়ে যাওয়া ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি ভাবিয়ে তুলেছে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের বাইরেও হাজারের বেশি ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে রাজধানীতে। যাদের অনেকই ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্ত। সুযোগ পেলেই ছুরি, চাপাতি অথবা সামুরাই নিয়ে ছিনতাই করছে তারা।

হটস্পটগুলোতেই একের পর ছিনতাই : রাজধানীতে ৩ শতাধিক ছিনতাই স্পট থাকলেও হটস্পট ৫৫টি। ছিনতাই মামলার পরিসংখ্যান বলছে, এসব হটস্পটেই ঘটছে একের পর এক ছিনতাই। ডিএমপির তথ্য বলছে, গত তিন মাসে রাজধানীতে ৮৩টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। মার্চ ও এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে বেড়েছে ছিনতাইয়ের সংখ্যা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিলে রাজধানীতে ২৫টি ছিনতাই ঘটে। এর মধ্যে তেজগাঁওয়ে ৯টি, মতিঝিল, গুলশান ও ওয়ারীতে ৪টি করে এবং রমনা ও লালবাগে ২টি করে। অথচ তেজগাঁওয়ে ছিনতাইয়ের হটস্পট সবচেয়ে বেশি। এর পরই মতিঝিল ও ওয়ারী। হটস্পট চিহ্নিতের পরেও ছিনতাই ঠেকাতে না পারা দুঃখজনক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে অনেক ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে না। কেননা মানুষ মোবাইল ও মানিব্যাগ খোয়ালে প্রায় সবাই হারানো জিডি দায়ের করেন।

মামলা নিতে এখনো অনীহা পুলিশের : পুলিশের শীর্ষ মহল থেকে বারবার সহজেই মামলা নেওয়ার কথা বলা হলেও থানায় বদলায়নি আগের সংস্কৃতি। ৯ এপ্রিল মতিঝিলে জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাইয়ের শিকার হন মো. মামুনুর রশিদ নামে এক ব্যাংকার। দুই ছিনতাইকারী পিস্তল ঠেকিয়ে তাঁর ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে অটোরিকশায় আরামবাগের দিকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর তাঁর মামলা করতেই লেগেছে প্রায় এক মাস। তা-ও মতিঝিল বিভাগের ডিসির সুপারিশে মামলা নেয় থানা। এজাহার লেখা হয় ভিকটিমের বদলে থানার ওসির ইচ্ছা অনুযায়ী।

মামুনুর রশিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ঘটনাস্থলের কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশের একটি টহল গাড়ি। ছিনতাই হওয়ার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে তিনি ওই টহল টিমের কাছে সহযোগিতা চান। টহল টিম ছিনতাইকারীদের পিছু না নিয়ে তাঁকে থানায় অভিযোগ করতে বলে। পরে থানায় মামলা করতে গেলে নানান টালবাহানা শুরু হয়। ‘ওসি স্যার নেই, ছিনতাইয়ের প্রমাণ কী? আমরা তদন্ত করে দেখি’, এমন বিভিন্ন অসিলায় কালক্ষেপণ করা হয়। তিনি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে থানায় গেলে দেওয়া হয় অন্য অজুহাত। প্রায় এক মাস কয়েক দিন পরপর থানায় গেলেও মামলা না নেওয়ায় আশা ছেড়ে দেন। একপর্যায়ে ডিসির কাছে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে বললে তিনি ওসিকে মামলা নিতে বাধ্য করেন। মামুন অভিযোগ করেন, ‘মামলায় অস্ত্র ঠেকানোর কথা উল্লেখ করতে দেওয়া হয়নি। অস্ত্রের কথা বললে থানা পুলিশ বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকে। বলতে থাকে ওটা খেলনা পিস্তল নাকি আসল পিস্তল, পিস্তল নাকি রিভলবার? নতুন হয়রানির ভয়ে ভেবেছি অস্ত্রের কথা না লেখুক, অন্তত মামলাটা হোক। ৫ মে মামলা রুজু হলেও এখনো তদন্ত এগোয়নি।’ এ বিষয়ে মতিঝিল থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘ভুলের ঊর্ধ্বে কেউ না। আমারও ভুল থাকতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে কঠোর বার্তা : ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ছিনতাইসহ যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সব সময় আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। কিন্তু শতভাগ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। গ্রেপ্তারের বাইরে থাকা ওই অপরাধীরা দুয়েকটি ঘটনা ঘটিয়ে বসে। আবার যারা গ্রেপ্তার হয় তারা কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। ডিএমপির সব থানায় কঠোর নির্দশনা দেওয়া হচ্ছে। সক্রিয় ছিনতাইকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে। সেই সঙ্গে জামিনে থাকা অপরাধীদের বর্তমান পরিস্থিতি জানতেও কাজ করছে পুলিশ।’