মঙ্গলবার   ০৯ জুন ২০২৬   জ্যৈষ্ঠ ২৫ ১৪৩৩   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

তিন বছরে সরকারকে সুদ দিতে হবে ৪ লাখ ৩০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:২৫ এএম, ৯ জুন ২০২৬ মঙ্গলবার

সরকারের সুদব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুদ খাতে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ঘাটতি বাজেট অর্থায়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে তিন বছরে সরকারকে সুদ দিতে হবে ৪ লাখ ৩০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এক্ষেত্রে সুদ ব্যয় কমানোর একমাত্র সমাধান হিসেবে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাজেটে ক্রমবর্ধমান সুদ ব্যয় আর্থিক শৃঙ্খলায় চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতি বছর সরকারকে তার ব্যয় মেটাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ করতে হচ্ছে। এই ঋণ দুইভাবে নেওয়া হয়—দেশীয় খাত থেকে এবং বিদেশি ঋণও নিতে হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সুদ খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আগামী দুই অর্থবছরে, অর্থাৎ ২০২৭-২৮ ও ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সুদ খাতে ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং ১ লাখ ৬১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সুদব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সরকারের ঋণ অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে সংশোধিত বাজেটে সুদ খাতে ব্যয় বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। সরকারের ঋণ কমিয়ে আনতে না পারলে আগামী অর্থবছরেও প্রাক্কলনের চেয়ে সুদ খাতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।

অর্থ বিভাগের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের ঋণের ওপর সুদব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আয়ের তুলনায় সুদ পরিশোধের খাতে ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়াই এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ।

সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণ গ্রহণের পরিমাণও বেড়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সুদের হার বৃদ্ধির ফলে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ এখন শুধুমাত্র সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে।

বিদেশি ঋণের সুদব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থাপনা শুধু আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যই নয়, বরং এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক ঋণমান বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতের উন্নয়ন সম্ভাবনা সুরক্ষিত রাখার জন্য অপরিহার্য। সম্প্রতি বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দকৃত বাজেটের পরিমাণ যে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা এই বিষয়টির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুদব্যয় বাড়ার ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। কারণ সরকারের মোট ব্যয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ সুদ পরিশোধে চলে গেলে উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয় করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের গতিও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ ছাড়া ক্রমবর্ধমান সুদব্যয় সরকারের ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত দেয়। নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণের দায় পরিশোধের প্রবণতা দেখা দিলে তা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।