শুক্রবার   ০৫ জুন ২০২৬   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪৩৩   ১৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

খালি হচ্ছে মায়ের কোল

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:৫৩ এএম, ৫ জুন ২০২৬ শুক্রবার

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জের নয়লাভাঙ্গা ইউনিয়নের বিরহামপুরে সরকারি খাস জায়গায় বসবাস রোজিনা-রনি দম্পতির। কখনো কৃষি শ্রমিক অথবা রাজমিস্ত্রির কাজ করে টানাপোড়েন চলে রনিদের সংসার। এর মধ্যেই ঘর আলো করে জন্ম নেয় তাদের প্রথম সন্তান লামিয়া। রনি বলেন, সারা দিনের কাজ শেষে ঘরে ফিরে মেয়েকে কোলে নিলে ফিক করে হেসে দিত। মেয়ের হাসিতে ক্লান্তি ভুলে ওর সঙ্গে খেলায় মেতে উঠতাম। সংসারে অভাব ছিল কিন্তু সুখের কমতি ছিল না। আমাদের সাজানো সংসার তছনছ করে দিল হাম। সন্তান হারিয়ে আমরা এখন নিঃস্ব। আমার স্ত্রী সারা দিন সন্তানের জামা, খেলনা কোলে নিয়ে কাঁদে।

ছোট্ট লামিয়ার মতো ৬০০-এর বেশি শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে হাম। সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা-মা। থমকে গেছে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। যে শিশুর কোলাহলে মেতে থাকত পুরো বাড়ি এখন সেখানে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। অনেক দম্পতির বিয়ের দীর্ঘ সময় পরে মিলেছে সন্তান লাভের সুখ। কিন্তু হাম আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে তাদের সন্তান। হঠাৎ দেশজুড়ে হাম ছড়িয়ে পড়লে নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে সরকার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত বুধবার পর্যন্ত সারা দেশের ১ কোটি ৮৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫৩ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকা দেওয়ার ২ মাস পেরিয়ে গেলেও কেনো হামের সংক্রমণ থামছে না-এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক         অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, টিকাদান কার্যক্রম যখন শুরু হয়, তখনই আমরা বলেছিলাম-যথেষ্ট প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই যেভাবে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তাতে ৯৫ ভাগ কাভারেজ পাওয়াই কঠিন। কারণ এটা অন্য টিকার মতো না যে, কাভারেজ কিছু কম হলেও কাজ হবে। হামের টিকার কাভারেজ ৯৫ ভাগের কম হলে এর সংক্রমণ হতে থাকবে, আর এবার সেই ঘটনাটাই ঘটেছে। এই জনস্বাস্থ্যবিদ আরও বলেন, এটা সাধারণ টিকার মতো না। হামের টিকা ৯ মাসে এবং ১৫ মাসে দেওয়া হয়। কিন্তু এই টিকা তো দেওয়া হচ্ছে ৬ মাস থেকে- তাহলে বয়স পরিবর্তন হয়েছে। আবার দেওয়া হচ্ছে ৫৯ মাস পর্যন্ত, তার মানে ১৫ মাসেরও পরিবর্তন হয়েছে। এই যে পরিবর্তনগুলো-তা অনেক মা জানেন না, কেননা তাদের জানানোর জন্যে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা হয়নি। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের দ্বিধা থাকবে-যে ৯ মাসের জায়গায় ৬ মাসে টিকা দেব, কোনো ক্ষতি হবে না তো! কিংবা ৯ মাসের জায়গায় ৫৯ মাসে টিকা দেব-আমার শিশুর কোনো ক্ষতি হবে না তো! এই বিষয়গুলো যদি আগে থেকে রেডিও, টিভি, মাইকিং, স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করত, তাহলে টিকার কাভারেজ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আমার ধারণা বহু পকেট রয়েছে-যেখানে ৯৫ ভাগ কাভারেজ পাওয়া যায়নি। এর ফলেই ভাইরাসের সংক্রমণ থামানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ২ নম্বর হাম ওয়ার্ডে, ছোট্ট একটি বেডে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে আয়ান হাওলাদার। হাতে ক্যানোলা, চোখে ক্লান্তি-মাত্র আট মাস বয়সেই যেন লড়ছে বড় এক যুদ্ধে। গত চার দিন ধরে উচ্চ জ্বরে হাসপাতালে ভর্তি আয়ান। গত ৩১ মে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে ভর্তি করা হলেও চার দিন পেরিয়ে এখনো উন্নতির লক্ষণ নেই। বিছানার পাশে বসে ছেলেকে আগলে রেখেছেন মা সুমাইয়া। তিনি বলেন, ‘আমার প্রথম ছেলে আয়ান। গত ১৪-১৫ দিন আমরা শুধু ওকে নিয়েই আছি। আমাদের খাওয়াদাওয়া কিছুই ঠিক নেই। ওর বাবাও চার দিন ধরে দৌড়াদৌড়ি করছে। যা টাকা ছিল সব শেষ। এখন ধারকর্জ করে চিকিৎসা চালাচ্ছি। আমার সোনামানিকটার দিকে তাকাতে পারি না। অনেক দুর্বল হয়ে গেছে সে।’ হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে তাতে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। মহামারি যেভাবে মোকাবিলা করা হয় সেভাবে কাজ করতে হবে। প্রাইমারি কেয়ার, সেকেন্ডারি এবং আইসিইউ এভাবে স্তরবিন্যাস করে সেবা দিতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে অপুষ্টির শিকার শিশুদের শনাক্ত করে আইসোলেশন করতে হবে। নয়তো দেখা যাচ্ছে একদিকে টিকা দিচ্ছে আরেক দিকে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘টিকা দেওয়ার জন্য মাইক্রোপ্ল্যানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় এই টিকা ক্যাম্পেইনে সরকার পরিকল্পনা করার সময় পায়নি। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ না করলে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হামের এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল।’