শুক্রবার   ০৫ জুন ২০২৬   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪৩৩   ১৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

স্যাটেলাইটে উঠে এলো ইসরায়েলের বর্বরতা

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:৩০ এএম, ৫ জুন ২০২৬ শুক্রবার

দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে দুই বোন রিম ও ওয়ালার কবর জিয়ারত করতে চান ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মুহান্নাদ কিশতা। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথে একটি নির্মম বাস্তবতার সম্মুখীন হন তিনি; মানচিত্রে আর সেই কবরস্থানই নেই।

খান ইউনিসের মান এলাকার শেখ মোহাম্মদ কবরস্থান সম্প্রতি হালনাগাদ হওয়া স্যাটেলাইট চিত্রে সম্পূর্ণ মুছে গেছে। এর জায়গা নিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর তাঁবু ও সাঁজোয়া যানসমৃদ্ধ একটি সামরিক ঘাঁটি। গুগল আর্থে যুক্ত হওয়া উচ্চ রেজুলেশনের এই চিত্র ধারণ করা হয়েছে গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি।

আলজাজিরাকে কিশতা বলেন, এই যুদ্ধে মৃতরাও রেহাই পায়নি। আমি যদি গিয়ে দেখি জায়গাটা মরুভূমির মতো হয়ে গেছে, আমার বোনদের কবর নেই, তাদের জন্য দোয়া পড়ার কোনো স্থান নেই, তাহলে আমার অনুভূতি কী হবে?
নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ গাজা, স্যাটেলাইটে উঠে এলো ইসরায়েলের বর্বরতা  
ট্রাম্পকে কড়া বার্তা মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের, ইরান যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব পাস

নতুন স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, পুরো অঞ্চলজুড়ে অসংখ্য পাড়া-মহল্লা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বেঁচে থাকা মানুষগুলোকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে অস্থায়ী শিবিরে, যেগুলো ভূমধ্যসাগরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ গাজা, স্যাটেলাইটে উঠে এলো ইসরায়েলের বর্বরতা  
লেবাননে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, সার্বিয়ান শান্তিরক্ষী নিহত

ফিলিস্তিনিদের কাছে এই হালনাগাদ মানচিত্র চলমান ধ্বংসযজ্ঞের এক বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে প্রায় ৭৩ হাজার মানুষের প্রাণহানির বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে।

ইউরো-মেড মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৯৪ শতাংশ কবরস্থান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। স্মৃতি বহনকারী এসব স্থানকে সামরিক ব্যারাকে রূপান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংস্থাটির।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, গাজার বড় বড় আবাসিক কেন্দ্রগুলো প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। ফলে উপত্যকার ভূগোলই বদলে গেছে। রাফাহ শহরে ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা এতটাই ব্যাপক যে একেকটি পাড়া অন্যটির সঙ্গে আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাল আল-সুলতানের সৌদি পাড়া সাতশ বাহান্ন ইউনিটের বিশাল আবাসন প্রকল্প এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ।

২০২৪ সালের শুরুতে রাফাহ অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন লাল রেখা টেনেছিলেন। কিন্তু ইসরায়েল সেখানেও অভিযান চালায় এবং এ নিয়ে কার্যত কোনো পরিণতির মুখোমুখি হয়নি। বর্তমানে রাফাহর অধিকাংশ এলাকা ধ্বংস হয়ে গেছে। রাফাহর সামগ্রিক দৃশ্যে এখন কেবল ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রাস্তার অস্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায়।

শহরের পশ্চিমাংশে অবস্থিত সুইডিশ গ্রামটিও প্রায় পুরোপুরি মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। একসময় ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী প্রাণবন্ত এই জনপদে প্রায় ১৩০০ মানুষ বাস করতেন। ১৯৬৫ সালে আন্তর্জাতিক সহায়তায় ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য এটি গড়ে তোলা হয়েছিল।

এই গ্রামের অর্থনীতি পুরোপুরি সমুদ্রনির্ভর ছিল। স্থানীয় জেলেদের নৌকা প্রতিদিন এখানকার উপকূল থেকে মাছ ধরতে যেত। সমুদ্রতীরবর্তী ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নৌকা মেরামতের ঘর এবং সুইডিশ জনগণের উপহার হিসেবে নির্মিত একটি কমিউনিটি সেন্টার ছিল গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

বর্তমানে এলাকাটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। দাঁড়িয়ে আছে মাত্র পাঁচটি বাড়ি। একসময় অবরুদ্ধ গাজার বাইরের বিশ্বের সঙ্গে একমাত্র সংযোগপথ হিসেবে পরিচিত রাফাহ সীমান্ত ক্রসিংও ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। যাত্রী আগমন-প্রস্থান টার্মিনাল, ভিআইপি অভ্যর্থনা কেন্দ্র, মানবিক সহায়তা ট্রাকের জন্য নির্ধারিত লজিস্টিকস সুবিধা এবং প্রশাসনিক কার্যালয়ের জায়গায় এখন রয়েছে শক্তিশালী সামরিক পর্যবেক্ষণ পোস্ট ও কাঁটাতারের বেড়া।

খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চলের বানি সুহাইলা, আবাসান ও আল-জানা এলাকার মধ্য দিয়ে সামরিক করিডোর তৈরি করা হয়েছে। এসব এলাকার আবাসিক ভবনের মাঝেই অবস্থান নিয়েছে ট্যাংক। যুদ্ধের আগে এসব অঞ্চল ছিল খান ইউনিসের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ কৃষি ও আবাসিক এলাকা। প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ বহু প্রজন্মের পরিবার নিয়ে সেখানে বসবাস করতেন।

তীব্র বোমাবর্ষণ ও সামরিক সরবরাহপথ তৈরির জন্য পুরো ব্লক ধ্বংস করার পর অধিকাংশ মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে। অনেকে উপকূলীয় আল-মাওয়াসির জনাকীর্ণ তাঁবুশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যরা মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহর স্কুল ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন।

কাতারের অর্থায়নে নির্মিত হামাদ সিটিও এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। একশ পঁয়ত্রিশ মিলিয়ন ডলারের এই আবাসন প্রকল্পে তিপ্পান্নটি আধুনিক পাঁচতলা ভবনে প্রায় তিন হাজার আবাসিক ইউনিট ছিল।

ধ্বংসের আগে এখানে প্রায় পনেরো হাজার মানুষ বাস করতেন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন নিম্নআয়ের পরিবার এবং পূর্ববর্তী সংঘাতে বাস্তুচ্যুত মানুষ। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ভবনগুলো এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ।

জাতিসংঘের শিশু তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, গাজার সাতানব্বই শতাংশের বেশি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ফলে ৬ লাখ ৫৮ হাজার শিশু দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয় ধ্বংস করা হয়েছে, নয়তো বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা এবং ১৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। দক্ষিণ গাজার আল-ইসরা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এসব ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রিত সামরিক বিস্ফোরণের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

রাফাহ ও খান ইউনিসের কৃষিজমি এবং গ্রিনহাউস একসময় পুরো গাজার খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানকার জমিতে টমেটো, শসা, মরিচ, জলপাই ও বিভিন্ন সাইট্রাস ফল উৎপাদিত হতো। শত শত গ্রিনহাউস গাজার দৈনন্দিন খাদ্যচাহিদার চল্লিশ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করত।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজার ৫ শতাংশেরও কম কৃষিজমি ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। শাকুশ এলাকায় ইসরায়েলি বুলডোজার গ্রিনহাউস ধ্বংস করেছে এবং উপরিভাগের উর্বর মাটি সরিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে খাদ্যসংকট আরও তীব্রভাবে বেড়েছে।

খান ইউনিসের সাংবাদিক ওলা আবু মোআমের বলেন, খাবারের সন্ধানে মানুষের ছুটে চলার দৃশ্য অত্যন্ত নির্মম। আমরা এমন এক দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, যা যে কোনো সময় শুরু হতে পারে। অনেক পরিবার স্যুপ রান্নাঘর থেকে খালি হাঁড়ি নিয়ে ফিরে আসে। তারা কোনো খাবারই সংগ্রহ করতে পারে না।

২ দশমিক ৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে ১ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের অনেককে দশবারেরও বেশি স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। জনসংখ্যার ষাট শতাংশ পুরোপুরি ঘরবাড়ি হারিয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে আল-মাওয়াসি এলাকার তাঁবুগুলোর চরম ঘনত্ব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সমুদ্রতীর ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে গড়ে উঠেছে এসব শিবির। এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্যমান প্রমাণের পাশাপাশি গাজায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর বিষয়ে ইসরায়েলি সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে।

ইসরায়েলের চ্যানেল বারোর ফাঁস হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেনাবাহিনীকে গাজায় নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমরা গাজা উপত্যকার ৬০ শতাংশ এলাকা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছি। আমার নির্দেশ হলো তা ৭০ শতাংশে উন্নীত করা। আমরা সেখান থেকেই শুরু করবো।

গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির সময় একটি ‘হলুদ রেখা’ নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা দখলকৃত অঞ্চল চিহ্নিত করত। কিন্তু এরপরও সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে আরও এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতি হামাসের সঙ্গে হওয়া সেই যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন।

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থাকে যে মানচিত্র সরবরাহ করে, তাতে দেখা যায় তারা গাজার ৬৪ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের জন্য উপত্যকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা অপ্রবেশযোগ্য হয়ে পড়েছে।

চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে ইসরায়েলের সরে যাওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। নামমাত্র যুদ্ধবিরতিও সহিংসতা থামাতে পারেনি। আল জাজিরার হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৪০০ ইসরায়েলি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। সংঘাত পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বোমাবর্ষণের গতি আরও বেড়েছে।

গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বোর্ড অব পিসের উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ গত সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি স্থায়ী রূপ নিতে পারে।

ফিলিস্তিনিদের কাছে এই সংকট কেবল ভবন ধ্বংসের গল্প নয়। সাংবাদিক ওলা আবু মোআমের বলেন, অনেক সময় সাংবাদিকরা শিশুদের কান্নার প্রতি সম্মান দেখিয়ে ক্যামেরা বন্ধ করে দেন, কারণ হারিয়ে যাওয়া শৈশবের বেদনা ক্যামেরায় ধারণ করা সম্ভব নয়।

মুহান্নাদ কিশতা বলেন, স্যাটেলাইট ধ্বংস হওয়া ভবনের ছবি তুলতে পারে। কিন্তু যে মানুষটি নিজের বাড়ির খোঁজে ফিরে এসে কিছুই খুঁজে পায় না, তার অনুভূতি কোনো স্যাটেলাইট ধারণ করতে পারে না। সবচেয়ে কঠিন বিষয় ধ্বংস নয়, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা গল্পগুলো।