বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২৬   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪৩৩   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

ক্যাশিয়ার ওমর ফারুকের শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:৩১ পিএম, ৪ জুন ২০২৬ বৃহস্পতিবার

পিএসসির আলোচিত গাড়িচালক আবেদ আলীর রূপকথার মতো উত্থানের গল্প এবার যেন বাস্তবে রূপ নিয়েছে দ্বীপাঞ্চল ভোলায়। তবে এবারের নায়কের নাম মো. ওমর ফারুক, যিনি এলাকায় ফারুক ক্যাশিয়ার নামেই এক নামে পরিচিত। ১৯৮৮ সালে মাত্র ৭০০ টাকা মূল বেতন এবং সর্বসাকুল্যে ১২২৭ টাকা বেতনে স্বাস্থ্য সহকারী পদে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি।

চাকরির শেষ পর্যায়ে সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদে পদোন্নতি হওয়ার কথা থাকলেও এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ক্যাশিয়ার পদে জেঁকে বসে আছেন। আগামী ডিসেম্বরে তার অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও এরই মধ্যে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি। তাকে নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে পুরো ভোলাজুড়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মৃত খবিরুল মুন্সীর ছেলে ওমর ফারুক। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তদবির ও দুর্নীতির মাধ্যমে বাগিয়ে নেন ক্যাশিয়ারের পদ।

এই লাভজনক পদে আসীন হওয়ার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা কামিয়ে স্ত্রী, সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করে এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করেন ফারুক। তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর, দত্তকান্দি ও কাজি কান্দি গ্রামে যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই ফারুক ক্যাশিয়ারের জমি, বাগান ও খামার। স্থানীয়রা রসিকতা করে বলেন, দুইটি গ্রামের মালিকানাই যেন এখন এই ক্যাশিয়ারের দখলে।

ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চাঁদপুরের হাওলাদার স্টেটের তিন-চতুর্থাংশ এবং বেশ কিছু সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি নিজের কব্জায় নিয়েছেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন বাসিন্দা ও মোস্তফা মিয়াজী (ছন্দনাম) নামের এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, ফারুক ক্যাশিয়ারের বিরুদ্ধে কথা বললেই তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসবে। সে জমি কিছু নিয়েছে হুমকিতে, কিছু দখলে আর কিছু নামমাত্র টাকায়।


অনুসন্ধানে ফারুক ক্যাশিয়ার ও তার পরিবারের নামে-বেনামে থাকা বিপুল সম্পদের খোঁজ মিলেছে:

তজুমদ্দিন : নিজ বাড়ির পাশে ৬০ শতাংশ জমিতে কয়েক কোটি টাকার বাগানসহ তার ছেলের জন্য গড়ে তুলেছেন বিশাল মুরগির খামার। তজুমদ্দিন উত্তর বাজারে একটি তিনতলা ভবনের নির্মাণকাজ চলমান, যা ফারুকের পক্ষে সায়েম ও ইউনুছ নামের দুজন স্থানীয় রাজনৈতিক ক্যাডার দেখাশোনা করেন।

চরফ্যাশন ও নারায়ণগঞ্জ : চরফ্যাশন সদর, দক্ষিণ আইচা এবং নারায়ণগঞ্জের ফুলতলায় রয়েছে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জমি।

ঢাকা : ঢাকার মিরপুরের দুয়ারীপাড়ায় স্ত্রী মনোয়ারা বেগমের নামে গড়ে তুলেছেন বহুতল বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন।

তজুমদ্দিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালনকালে একক রাজত্ব কায়েম করেছিলেন ফারুক। সেখানে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তাকে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয়। কিন্তু সেখানে গিয়েও তার পুরনো স্বভাব বদলায়নি।

সম্প্রতি লালমোহন হাসপাতাল পুকুরের সরকারি মাছ চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফারুক ক্যাশিয়ারের নাম ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়।

একজন সাধারণ সরকারি ক্যাশিয়ার কীভাবে এত অর্থ-বিত্তের মালিক হলেন, তা নিয়ে ভোলাসহ লালমোহন-তজুমউদ্দিনের মানুষের মাঝে নানান প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দাড়ি-টুপি পরিহিত এই ভদ্রবেশী ক্যাশিয়ারকে হয়তো চেনে না দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অথবা তাকে সুফি সাহেব ভেবে মায়া দেখাচ্ছে। অবিলম্বে তার অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত ওমর ফারুকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, লালমোহন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দুই মাসের ছুটি নিয়ে তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে এলাকা ছাড়লেও তার পালিত ক্যাডার বাহিনী দিয়ে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সচল রেখেছেন তিনি।

এ বিষয়ে ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মুনিরুল ইসলাম জানান, সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি প্রথম তার নজরে এসেছে। পুরো বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।