মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২৬   জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪৩৩   ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

ছুটি শেষে বাসার গেটেই আক্রান্ত দুই নারী

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৭:৪৭ এএম, ২ জুন ২০২৬ মঙ্গলবার

মোহাম্মদপুরের ১০৮ স্পটে সক্রিয় ২০৫ ছিনতাইকারী

ঈদুল আজহার ছুটি শেষে ঠাকুরগাঁও থেকে বাসে করে রাজধানীর শ্যামলীতে নামেন দুই নারী। পরে রিকশায় করে মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোড এলাকায় নিজ বাসার সামনে পৌঁছান। হঠাৎ করেই দুই ছিনতাইকারী তাদের সামনে দাঁড়ায়। হাতে চাপাতি। পরনে ছিল লুঙ্গি। চাপাতির কোপ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওই দুই নারীর সঙ্গে থাকা লাগেজ, ব্যাগসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকের ঘটনা। এ ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মোহাম্মদপুরের অপরাধ জগতের কালো অধ্যায় ফের সামনে আসে।

এর আগে গত ৭ মার্চ রাতে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে হাঁটাহাঁটি করছিলেন দুদকের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন। এ সময় তিন ছিনতাইকারী চাপাতি ও সামুরাইয়ের ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে দুটি আইফোন, ২০ হাজার টাকাসহ মানিব্যাগ, দুটি ভিসা কার্ড ও হাতঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। আইফোনের পাসওয়ার্ডের জন্য ছিনতাইকারীরা তাকে আঘাত করলে তিনি মারাত্মক আহত হন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে মোহাম্মদপুরে ছিনতাই, ডাকাতি, লুট, খুনসহ সব ধরনের অপরাধ অন্য সময়ের তুলনায় বেড়েছে। ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে গুরুতর জখম ও খুনের ঘটনাও ঘটছে। ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে খোদ পুলিশও হামলার শিকার হচ্ছেন। যৌথবাহিনী নিয়মিত ব্লক রেইড ও বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে গ্রেফতার করলেও অবস্থার কোনো উন্নতি নেই।

গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, রাজধানী ও আশপাশে ৪৩২টি ছিনতাই স্পটের মধ্যে সব থেকে বেশি ১০৮টিই মোহাম্মদপুরে। এসব স্পটে ছিনতাইয়ের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ২০৫ জনের নাম উঠে এসেছে গোয়েন্তা রিপোর্টে। যদিও এ সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বেশির ভাগ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা হয়রানির ভয়ে মামলা করতে চান না। যারা মামলা করেন তারাও যথাযথ প্রতিকার পান না। ছিনতাইয়ের ঘটনা ভাইরাল না হলে থানাও গুরুত্ব দেয় না বলে অভিযোগ অনেক ভুক্তভোগীর।

পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের নবীনগর হাউজিং, চাঁদ উদ্যান, চন্দ্রিমা হাউজিং, তিন রাস্তার মোড়, জেনেভা ক্যাম্প ও এর আশপাশ, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড ও টাউন হল, বছিলা বেড়িবাঁধ ও বছিলা ব্রিজ এলাকায় বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। চাপাতি বা সামুরাই দিয়ে ভয় দেখিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে কিংবা অন্ধকারে সাধারণ মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে তারা। অনেক সময় অটোরিকশা কিংবা মোটরবাইকে এসে চোখের সামনে সব ছিনিয়ে নিচ্ছে। হামলার ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করারও সাহস পান না।

ওই এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে অনেকে হামলার শিকার হয়েছেন। এমনকি বাড়িওয়ালাদের বাসার সিসিটিভি খুলে ফেলতেও হুমকি দিয়েছে অপরাধীরা। তাদের ভয়ে অনেক বাড়িওয়ালা সিসি ক্যামেরা খুলে ফেলেছেন। কাঁটাসুর এলাকায় বিভিন্ন বাসা-বাড়ির গেটের সিসিটিভি ভাঙতে দেখা গেছে ছিনতাই চক্রের সদস্যদের।

নবী উল্লাহ নামে চাঁদ উদ্যান এলাকার এক নিরাপত্তাকর্মী যুগান্তরকে জানান, ছিনতাইকারীরা তাদের বাসার সিসি ক্যামেরা খুলে ফেলতে বলেন। ক্যামেরা না খুললে তাকে এবং তার ছেলের রক্ত দিয়ে গোসল করবে-এমন হুমকি দেয়। চাকরি রক্ষায় নিজের কিংবা ছেলের জীবন শেষ করতে পারবেন না বলে তিনি বাড়িওয়ালাকে জানান। পরে সিসি ক্যামেরা খুলে ফেলা হয়।

শুধু বাসিন্দারাই নন, পুলিশও ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হচ্ছেন। গত ১১ মে ভোরে মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকায় অভিযানের সময় পুলিশের ওপর হামলা চালায় ছিনতাইকারীরা। এ সময় পুলিশ পালটা গুলি ছুড়লে এক ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয় এবং চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।

এদিকে, ঈদের ছুটি শেষে বাসায় পৌঁছার আগেই ছিনতাইয়ের শিকার দুই নারীর বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাকিবুজ্জামান রাকিব সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত তিনজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এরমধ্যে একজনকে শনাক্ত করা গেছে। চক্রের সবাইকে গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। খুব দ্রুত তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ডিএমপির তথ্যমতে, মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে অর্ধশতাধিক অপরাধী দল বা গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি বড় এবং প্রধান গ্যাং রয়েছে, যাদের প্রত্যেকটিতে ১৫ থেকে ২০ জন করে সদস্য কাজ করে। ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত গ্রুপগুলোর মধ্যে, পাটালি, লেভেল হাই, ডাইল্লা, অ্যালেক্স, গাংচিল, লও ঠেলা, কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর গ্রুপ ও আকবর গ্রুপের নাম শীর্ষে রয়েছে। নিয়মিত অভিযানে এসব চক্রের সদস্যকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুর থানার একতা হাউজিং এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের মূলহোতা রুবেল ওরফে মাওরা রুবেলকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। আদাবর এলাকায় এক ডেলিভারিম্যানকে মারধর করে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেন তিনিসহ চক্রের সদস্যরা।

গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ৪৩২টি ছিনতাইয়ের স্পটে কমপক্ষে ৯৭৯ জন ছিনতাইকারী সক্রিয়। যাদের বেশির ভাগই ফৌজদারি মামলার আসামি। ছিনতাইয়ের হট স্পট হিসাবে তালিকায় রয়েছে মোহাম্মদপুর এলাকা। এ এলাকায় সবচেয়ে বেশি ১০৮টি ছিনতাইয়ের স্পট রয়েছে। এ এলাকায় ছিনতাইয়ের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ২০৫ জনের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) এনএম নাসিরুদ্দিন যুগান্তরকে জানান, মোহাম্মদপুরে পুলিশসহ যৌথবাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধীদের গ্রেফতার করছে। তবে এলাকাটি নদী এবং বেড়িবাঁধের কাছাকাছি হওয়ায় অপরাধীরা সহজেই আশপাশে পালিয়ে যেতে পারে। সব ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।