ট্রাম্প আদলের মহিষটি জাতীয় চিড়িয়াখানায়
আজকাল প্রতিবেদক, ঢাকা থেকে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৯:৪৩ এএম, ৩০ মে ২০২৬ শনিবার
হেয়ার স্টাইলে ব্যাপক সাদৃশ্য। চুলের রং অবিকল। আলবেনো জাতের মহিষটি সোস্যাল মিডিয়ায় আসার সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাল। তারপর শুরু হয় ব্যাপক হইচই। দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে সিএনএন, রয়টার্স, এএফপি, এএনআইসহ বিশ্বের প্রধান প্রধান অনেক আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর হয়ে যায়। কোরবানির জন্যে কেনা এই মহিষকে ঘিরে নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। ঈদের ঠিক আগের দিন সরকার মহিষটি কিনে নেয়। চিড়িয়াখানায় পাঠায় সংরক্ষণের জন্য। এখন ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানায় মানুষ ভীড় বাংলাদেশী ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ দেখার জন্য। ঈদের সময় এমনিতেই ভীড় চিড়িয়াখানায়। ভাইরাল মহিষ নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকার আশেপাশে এখন অনেক পশুর ফার্ম গড়ে উঠেছে। ভারত থেকে কোরবানির পশু রফতানি বন্ধের পর থেকে দেশীয় ফার্মগুলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর কাজ করছে। এ রকমই একটি খামার হলো নারায়নগঞ্জ শহরে অবস্থিত রাবেয়া এগ্রো ফার্ম। সেখানে গরু ও মহিষ লালন-পালন করা হয়। তারপর কোরবানীর মওসুমে তা বিক্রি করা হয়। ফার্মের মালিক জিয়া মৃধা আজকালকে জানান, প্রায় আট মাস আগে রাজশাহীর হাট থেকে তারা আলবেনো জাতের এই পিংকিশ কালারের এই মহিষটি তারা ক্রয় করেন। তাদের ফার্মে পালনের পর রোজার ঈদের কিছুদিন পরেই ঢাকার পাশের কেরানীগঞ্জ থানার জিঞ্জিরা এলাকার মোহাম্মদ ফরিদুজ্জামান শরন নামের এক ব্যবসায়ী মহিষটি কিনে নেন। তবে জিঞ্জিরায় তার এই মহিষ রাখার স্থান না থাকায় ঈদের ঠিক আগে ডেলিভারি নেবেন বলে রাবেয়া এগ্রো ফার্মেই রেখে দেন। এই সময়ে রাবেয়া এগ্রো ফার্মের মালিকের ছোট ভাই মহিষটির সঙ্গে আদলে মিল থাকায় তার নাম রাখেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। মহিষের ছবিসহ খবরটি সোশ্যাল মিডিয়ায় আসার সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাল।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বাংলাদেশের লোকাল মিডিয়ায় মহিষের ছবিযুক্ত সংবাদ প্রকাশ পায়। তারপর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়া খবরটি প্রকাশ করে। খবরের সঙ্গে ভিডিও যুক্ত হয়। সবাই অবাক হয়ে দেখতে থাকে যে, কীভাবে একটি পশুর সঙ্গে একজন মানুষের চেহারায় বিশেষ করে হেয়ার স্টাইলে এমন মিল হয়। জিয়া মৃধা বলেন, ‘পশুর সঙ্গে মানুষের কোনও তুলনা হয় না। তবে আমার ছোট ভাই ভালবেসে মহিষটির নাম রেখেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটা একটা প্রতীকী নাম’। দর্শনার্থীর চাপে জিয়া মৃধা তার প্রিয় মহিষটিকে এক পর্যায়ে লুকিয়ে রাখেন। কারণ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ ভীড় করতে থাকে। বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার কিংবা টিকটকের মানুষের ভীড় বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশে কোরবানীর পশুর নামাকরণ নতুন নয়। এক সময় ফুটবলার মেসির নামের সঙ্গে মিল রেখে ‘মেসি’ নামে গরুর নাম রাখা হয়েছিলো। এবারের ঈদেও নানা নামাকরণ হয়েছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হবার কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হেয়ার স্টাইলে অদ্ভূত মিল দেখে সবাই চমকে উঠেছিলেন। আলবেনো এই মহিষের দাম প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। দাম খুব বেশি নয়। কারণ প্রতি কেজি সাড়ে পাঁচ শত টাকা দরে মহিষ বিক্রি হয়েছে। আজকাল প্রতিনিধির কাছে জিয়া মৃধা মহিষটির অবস্থান জানাতে অস্বীকার করে বলেন, মহিষটি ক্রেতা নিয়ে গেছে। প্রকৃত পক্ষে এটি ছিলো একটি কৌশল। কারণ মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়ার বদৌলতে চাপ সামলাতে হিমসিম খেয়ে পরে আলবেনোকে আড়াল করে রাখে। মৃধা শুধু এটা বলেন যে, জিঞ্জিরা এলাকার বাসিন্দা মিস্টার শরণ গরুটি কিনে ডেলিভারিও নিয়ে গিয়েছে।
আজকাল প্রতিনিধি রাজধানী ঢাকার কাছে কেরানীগঞ্জ এলাকার জিঞ্জিরার রসুলপুর মহল্লায় তাবিজওয়ালা বাড়ির সন্ধান লাভ করে। ওই বাড়ির মালিক মিস্টার ফরিদুজ্জামান শরন গরুটি ক্রয় করেছেন। বাড়ির তৃতীয় তলায় এই বাড়িওয়ালা একই সঙ্গে ট্রাম্পের মালিকও। দীর্ঘক্ষণ কলিং বেল চাপার পর একটি জানালা খুলে একজন বয়স্ক মহিলা উঁকি দিলে আজকাল প্রতিনিধি ডোনাল্ড ট্রাম্পের খোঁজ নেন। জবাবে ওই মহিলা জানান, শরনসহ কেউই বাসায় নেই। তবে তারা মহিষটি ক্রয় করেছেন বলেও জানান। তবে তা ঈদের ঠিক আগে আগে তারা ডেলিভারি আসবে বলে জানান। বিষয়টি নিয়ে বেশ গোলক ধাঁধাঁর সৃষ্টি হয়। কেউ একজন লুকাচ্ছেন।
পবিত্র ঈদ উল আজহার দুই দিন আগে নারায়নগঞ্জের রাবেয়া এগ্রো ফার্মে লালগালিচা বিদায় অনুষ্ঠান। সত্যি সত্যি লাল মখমলের কাপড়ের ওপর পা দিয়ে মহিষটি যখন খামার থেকে ক্রেতার হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে আসে; তখন তার ওপর ফুল ছিটিয়ে দেয়া হচ্ছিল। ওই রাতে আবার জিঞ্জিরায় হাজির হন আজকাল প্রতিনিধি। এবার আর টার্গেট মিস হয়নি। আলোকসজ্জা আর লোকে গমগম করছে। শরনের বাসার সামনের এক চিলতে খালি জায়গায় ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের মহিষ বাঁধা। ডোনাল ট্রাম্পের মালিক পাশে দাঁড়িয়ে হাসছিলেন। তিনি আজকালকে বলেন, দুই মাস আগে তিনি যখন নারায়নগঞ্জ থেকে এই মহিষটি ক্রয় করেন; তখন এটি ভাইরাল হয়নি। তিনি এই মহিষ ক্রয় করেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তোষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কোরবানি করার লক্ষ্যে। মালিকের স্ত্রী জানালেন, প্রতি বছর গরু কিংবা ছাগল কোরবানি করার পর এবার মহিষ কোরবানি দেবার জন্যে তার ছেলে আবদার করে। এই আবদার মেটাতে মহিষ কোরবানী দিতে তারা এটি ক্রয় করেন। এখন তাদের কেনা কোরবানির পশু ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় তারা খুব খুশি।
ঈদের আগের দিন হঠাৎ নাটকীয়তা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের মহিষ কোরবানী হচ্ছে না। বিরল প্রজাতির এই মহিষ তারা সংরক্ষণ করবেন। মন্ত্রীর বার্তা নিয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি শরনের বাড়িতে যান। ক্রেতা সাংবাদিকদের বলেছেন, তারা মহিষটি থানায় হস্তান্তর করেছেন। সরকার মহিষের দাম পরিশোধ করবে। ক্রেতা আরও বলেন, তারা চান না যে, তাদের কারণে কোনও দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হোক। মহিষ নিয়ে তীর্যক মন্তব্য করেছিলো ইরান। রাশিয়ায় ইরানের দূতাবাস সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছে, বাংলাদেশে মহিষের নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প রেখে মহিষটিকে অপমান করা হয়েছে ! ঈদের আগের রাতেই থানা থেকে মহিষ যায় চিড়িয়াখানায়। ঈদের দিনে দর্শনার্থীরা আলবেনো প্রজাতির মহিষ দেখতে ভীড় করে।
অনেকে প্রশ্ন করছেন, আলবেনো প্রজাতির মহিষের নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ রাখায় সত্যিই কী সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছিলো ? এই প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা আজকালকে বলেন, ‘আমেরিকানরা এসব ফান কিংবা কার্টুন শোনে অভ্যস্ত। এসবের কারণে তারা কোনও প্রতিক্রিয়া দেখায় না। ফলে এ নিয়ে সম্পর্কে কোনও প্রভাব পড়েনি। তবুও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে সরকারকে সতর্ক করা হয়েছে যে, কোরবানী হয়ে গেলে তার সংবাদ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে। সে কারণে সতর্কতার অংশ হিসাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টিকে হ্যান্ডেল করেছেন।
