শনিবার   ৩০ মে ২০২৬   জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪৩৩   ১৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় পুশইন আতংক

হাসান মাহমুদ/মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:৪৭ এএম, ৩০ মে ২০২৬ শনিবার

‘মুসলিম খেদাও’ এজেন্ডায় মরিয়া বিজেপি 


পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ সীমান্তে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ নীতি অনুসরণ করে হিন্দুত্ববাদি সরকার হাজার হাজার বাংলা ভাষাভাষিদের দিল্লী ও গুজরাট এলাকা থেকে ধরে দলে দলে বাংলাদেশ সীমান্তে জড়ো করছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সীমান্তে সরকারীভাবে ‘বন্দিশালা’ করা হয়েছে তাদেরকে আটক রাখার জন্য। নির্মম অত্যাচারের শিকার এসব ভারতীয়কে বাংলাদেশি বানিয়ে ‘পুশইন’ করার চেষ্টা চলছে। এ কারণে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষি বাহিনী বিজিবিকে সতর্ক রাখা হয়েছে।  ভারতীয় সীমান্ত রক্ষি বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্ত জড়ো হয়ে ভূমি মাপার চেষ্টা করলে তাদেরকে সশরীরে বাধা দিয়ে চলেছে বিজিবি সদস্যরা। জোর করে সীমান্তনীতি ভঙ্গ করে জমি মাপার কাজ শুরু করতে চায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষি বাহিনী। তাতে সীমান্তে নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে বলে জানা যায়।
এদিকে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে তীব্র অভিবাসন সংকট তৈরি করায় সীমান্ত অচলাবস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে।  পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিজয়ের পর, রাজ্য প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ শুরু করে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভারতীয় নাগরিকদের অন্য রাজ্য থেকে ধরে এনে অবিলম্বে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগিরা। বিচারিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সরাসরি বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ২৫শে মে, পশ্চিমবঙ্গ মালদা ও মুর্শিদাবাদের সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলিতে তাদের প্রথম দুটি ‘হোল্ডিং সেন্টার’ খুলে দেয় ইন্টার্ন ব্যক্তিদের জন্য। হঠাৎ আটকের ভয়ে উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্ত চেকপোস্টের মতো চেকপয়েন্টে অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে শত শত পরিবারকে রাখার আয়োজন করা হয়েছে। পুশইন প্রক্রিয়া একটি অনানুষ্ঠানিক, অ-কূটনৈতিক বিষয়। স্থানীয় পুলিশ এবং বিএসএফ সীমান্তে জন্ম সনদ এবং পরিচয়পত্র দেখার জন্য নথি যাচাইয়ের ডেস্ক স্থাপন করেছে। 
গত কয়েক মাস ধরে, দিল্লি ও গুজরাটের মতো জায়গায় অভিবাসীদের পদ্ধতিগতভাবে আটক করা হয়েছে এবং নির্বাসনের জন্য ত্রিপুরা ও আসামের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যে বিমান বা পরিবহনের মাধ্যমে জড়ো করা করা হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে যে, একতরফা পুশ-ইনগুলি তার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে। ঢাকা দাবি করেছে যে, কোনো প্রত্যাবাসনের জন্য অনানুষ্ঠানিক ধাক্কাধাক্কির পরিবর্তে আনুষ্ঠানিক, দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ অংশে বিজিবি উল্লেখযোগ্যভাবে সীমান্ত নজরদারি বাড়িয়েছে। অননুমোদিত প্রবেশ রোধে জনসচেতনতা প্রচার এবং সক্রিয় সীমান্ত টহল শুরু করেছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষক এবং অভিবাসী গোষ্ঠীগুলি তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকদের প্রোফাইল করা হচ্ছে। ভুলভাবে আটক করা হচ্ছে এবং সীমান্তের ওপারে রাতের বেলায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিজিবির সাথে স্থানীয় মানুষ ভারত কর্তৃক পুশইন বন্ধ করতে সীমান্তে জড়ো হয়ে কাজ করছে।
আটককৃতরা জানায়, তারা ভারতীয় নাগরিক কিন্তু বিভিন্ন রাজ্য থেকে বাংলাভাষী বলে তাদেরকে ধরে এনে পুশইনের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা সীমান্তে এই পরিস্থিতির কারণে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে ভারতের সাথে সীমান্ত এলাকায় পুশইন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সীমান্তে, বিশেষ করে সাতক্ষীরা, কুমিল্লা ও পঞ্চগড় অঞ্চলে এই সংকট নতুন করে তীব্ররূপ নিয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক বা আইনি যাচাই-বাছাই (যেমন দ্বিপাক্ষিক ভেরিফিকেশন বা ফ্ল্যাগ মিটিং) ছাড়াই বাংলাদেশে পুশইন করতে চায় তারা।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্য, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সংক্রান্ত কড়াকড়ির প্রভাব সীমান্তে এসে পড়ছে। ভারতীয় পুলিশ অনেক সময় ভারতে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসরত বা আটককৃত বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ র্ট্যাগ দিয়ে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করছে। পরবর্তীতে বিএসএফ তাদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করায় জটলা তৈরি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠাতে হলে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া (যেমন জাতীয়তা নিশ্চিত করা, পুশব্যাক সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা) অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই রাতের অন্ধকারে কিংবা আকস্মিকভাবে সীমান্তে এই পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়, যা আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিপন্থি। সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরা (যেমন কলারোয়ার কাকডাঙ্গা, তলুইগাছা, বৈকারী, মাদরা সীমান্ত) এবং পঞ্চগড় ও কুমিল্লা সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক শত শত মানুষকে জড়ো করার খবর পাওয়া গেছে। ভারতীয় গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, অনেককে ভারতের দূরবর্তী রাজ্য (যেমন হরিয়ানা) থেকে চোখ বেঁধে সীমান্তে এনে বাংলাদেশে পুশব্যাক করার ঘটনাও অতীতে ঘটেছে।
উদ্ভুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তে ‘দেয়াল’ হিসেবে দাঁড়িয়েছে এবং অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়েছে। পুশব্যাক ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নিয়মিত টহল দ্বিগুণ করা হয়েছে। এমনকি বিশেষ ছুটির দিন বা উৎসবের সময়েও রাত-দিন বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে। সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে এবং অবৈধভাবে কেউ যাতে সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে, সেজন্য বিজিবির পক্ষ থেকে নিয়মিত সতর্কতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে। বিজিবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আইনি প্রক্রিয়া এবং দ্বিপাক্ষিক ভেরিফিকেশন ছাড়া জোরপূর্বক কোনো অনুপ্রবেশ বা আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের লঙ্ঘন বরদাশত করা হবে না। এই পুশব্যাক পরিস্থিতির কারণে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও চরম উৎকণ্ঠা কাজ করছে।