আরাকান আর্মির জেলে ‘অপহরণ রহস্য’
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৮:৪৫ পিএম, ২৪ মে ২০২৬ রোববার
জালে তখন মাছ উঠছিল ঝাঁকে ঝাঁকে। গভীর সমুদ্রে নতুন ট্রলার থামিয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে জাল টানছিলেন ইলিয়াস মাঝি। হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে আসে ইঞ্জিনের তীব্র শব্দ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কালো রঙের একটি স্পিডবোট ঘিরে ফেলে ট্রলার। হাতে ভারী অস্ত্র। মুখে কালো কাপড় বাঁধা। কয়েকজন সশস্ত্র লোক ট্রলারে উঠে চিৎকার করতে করতে। পালানোর কোনো সুযোগ ছিল না।
এক দমে কথাগুলো বলে গেলেন ইলিয়াস। দমবন্ধ সে মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে ঘামছিলেন রীতিমতো। বলছিলেন, মিয়ানমারের আরাকান আর্মির স্পিডবোট, আর আমাদের মাছ ধরার ট্রলার। হাত বেঁধে, চোখে কালো কাপড় পরিয়ে দুই ছেলেসহ আমাদের তুলে নিয়ে যায়।
এর পরের গল্প আরও হাড়হিম করা। ছয় মাসের বন্দিজীবন। খাবার ছিল আধা সিদ্ধ ভাত আর সিদ্ধ কলাগাছ। মসলা ছাড়া রান্না। সেটাও দিতো একবেলা। অমানসিক নির্যাতন আর প্রতিদিন বেঁচে ফেরার অপেক্ষা।
ইলিয়াস মাঝি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মারধরে আমার দুইটা দাঁত পড়ে গেছে। সারাক্ষণ পায়ে শিকল বাঁধা থাকতো। জোর করে ক্যাম্পের কাজ, ক্ষেতের শ্রম, পাথর টানাসহ অনেক কঠোর পরিশ্রম করানো হতো। সামান্য বিশ্রাম নিলেই মারতো লোহার রড দিয়ে। ঠিকমতো ঘুমাতেও পারতাম না।’
কোরআন ছুঁইয়ে শপথ করানো হয়, যাতে ভবিষ্যতে আর তাদের এলাকায় মাছ শিকার না করি। বলেন ইলিয়াস মাঝি।
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের এই জেলে ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু ফেরেনি তার ট্রলার। ঋণ করে বানানো ৭ লাখ টাকার ট্রলারটি এখনো আরাকান আর্মির দখলে। একদিকে ঋণের চাপ, অন্যদিকে পরিবার চালানোর দায়, সব মিলিয়ে আবারও সমুদ্রে নামা ছাড়া উপায় দেখছেন না তিনি। অথচ সেই সমুদ্র এখন তার কাছে মরণাতঙ্ক।
সমুদ্রের গর্জন শুনে বড় হয়েছেন নূরুল আলম মাঝি। শৈশবে কবে প্রথম নৌকায় ভেসে দরিয়ায় গিয়েছিলেন, চল্লিশোর্ধ নূরুলের মনেও নেই। দরিয়ার ভয় বলতে ছিল শুধু তুফান। আর এখন দরিয়ায় বড় ভয় আরাকান আর্মি। কোনো কারণ ছাড়াই যখন তখন সমুদ্র থেকে বাংলাদেশের জেলেদের নৌকাসহ অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের এই সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
ছয় মাসের বেশি সময় আরাকান আর্মির হাতে বন্দি থাকার পর বাড়ি ফেরা সুঠাম দেহের নূরুল আলম শরীরের চামড়া টেনে টেনে দাগ দেখিয়ে বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘অমানসিক নির্যাতন করা হয় আমাদের ওপর। আরাকান আর্মির কাছে অনেকে আটক ছিল, প্রত্যেককে মারধর করা হয়েছে।’
নাফ নদী থেকে সেন্টমার্টিন উপকূল জেলেদের কাছে এখন আতঙ্ক
নাফ নদী। যার অর্ধেক বাংলাদেশের অর্ধেক মিয়ানমারের। নদীর এপারে বাংলাদেশের অতিদরিদ্র জেলেপল্লি। পশ্চিমে বাংলাদেশের টেকনাফ, সাবরাং, জালিয়াপাড়া, দক্ষিণপাড়া কিংবা শাহপরীর দ্বীপ। পূর্বে ওপারে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির দখলে থাকা মংডু, কানিনচ্যাং, নয়াং চ্যাং, ধনখালী। নদী যেখান থেকে সাগরে মিশেছে তার কিছুদূর দক্ষিণে এগিয়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। সীমান্তে মিয়ানমারের আলী থান কাইয়্যু। নাফ নদীর মোহনা থেকে সেন্টমার্টিনের মাঝামাঝি এলাকাটি জেলেদের বড় আতঙ্ক। কখন, কোথা থেকে স্পিডবোট এসে ঘিরে ফেলবে, সে ভয় নিয়েই প্রতিদিন মাছ ধরতে যেতে হয় তাদের।
সরকারি কোনো বাহিনী না হয়েও আরাকান আর্মির সদস্যরা সীমান্ত অতিক্রম করে জেলেদের অস্ত্রের মুখে অপহরণ করছে, নির্যাতন চালাচ্ছে ও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সম্পর্কে তথ্য জানতে চাচ্ছে জেলেদের কাছে। অমানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরেছেন অনেকেই, কেউ ফিরে আসছেন অসুস্থ বা পঙ্গু হয়ে, আবার অনেকে আর ফিরছেনই না।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য, জেলে, সীমান্তরক্ষী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে জাগো নিউজের কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে, শুরুতে আরাকান আর্মির সদস্যরা বাংলাদেশি জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতো। তবে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে আরাকান আর্মি খাদ্য ও নিত্যপণ্যের তীব্র সংকটে পড়ে। কিন্তু দেশের ভেতরে তেমন সহযোগিতা না পেয়ে ধীরে ধীরে তারা অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ওপর।
গত এক বছরে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারে পাচারের সময় চাল, আলু, চিনি, ডালসহ নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী জব্দ করেছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জেলেরা সাধারণত মাছ ধরার উদ্দেশ্যে সাগরে গেলেও আরাকান আর্মির খাদ্যচাহিদা ও তৎপরতার কারণে তাদের এখন অপহরণের ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। তারা ট্রলারের মাছ, খাবার সবই লুটে নেয়।
জাগো নিউজের অনুসন্ধানে উঠে আসে আরাকান আর্মির বাংলাদেশি জেলে অপহরণ রহস্যের নেপথ্যে স্পর্শকাতর সব তথ্য।
যেভাবে যেখানে অপহরণ হয়
গভীর সমুদ্রে দৃশ্যমান কোনো সীমারেখা নেই। জোয়ার-ভাটা, নাব্য পরিবর্তন ও মাছের অবস্থান অনুযায়ী জেলেদের নৌকা প্রায়ই সীমানার কাছাকাছি চলে যায়। স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, অনেক সময় তারা বুঝতেই পারেন না কখন মিয়ানমারের জলসীমার কাছে পৌঁছে গেছেন। অস্পষ্ট সীমান্ত এই দুঃসহ বাস্তবতা আরও প্রকট করে তুলেছে। ফলে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত উপকূলজুড়ে জেলে পরিবারগুলো দিন কাটাচ্ছে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে।
গত ৩০ এপ্রিল দুপুরে টেকনাফ উপজেলার সাবরাং নয়াপাড়া এবং শাহপরীর দ্বীপ সংলগ্ন নাফ নদীর মোহনায় মাছ শিকারের সময় আরাকান আর্মি দুটি নৌকাসহ বাংলাদেশি সাত জেলেকে ধরে নিয়ে যায়। এরা হলেন- নয়াপাড়া এলাকার আব্দুর রহমান, আবদুল মতলব, গুরা মিয়া, মো. হাসান এবং শাহপরীর দ্বীপের ডেইলপাড়া এলাকার আহমদ আলী, নুরুল আবছার ও আবদুর রহিম।
আহমদ আলীর স্ত্রী মুন্নি আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে জাগো নিউজকে বলেন, ‘নাফ নদী থেকে মাছ ধরার সময় আমার স্বামী ও দুই ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। দুপুরে মাছ শিকার করে বাড়ি ফেরার কথা। কিন্তু অন্য জেলেদের মাধ্যমে জানতে পারি তাদের ধরে নিয়ে গেছে। আমরা খুবই গরিব। তারা না ফিরলে আমরা অনাহারে থাকবো। তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহায়তা কামনা করছি।’
বাংলাদেশের সীমান্তে শাহপরীর দ্বীপের নাফ নদী, অন্যদিকে মিয়ানমারের মংডু এলাকা। মাঝে নাফ নদী দুই দেশকে ভাগ করেছে। জেলেরা যখন শাহপরীর দ্বীপ থেকে নাফ নদী হয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যান, তখন তারা সেন্টমার্টিনের দিকেই যেতে থাকেন। কারণ সেখানে বেশি মাছ পাওয়া যায়। পূর্ব দিকে ন্যাংক্ষদিয়া, যা মিয়ানমার সীমানা। আর পশ্চিমে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। এই প্রবাল দ্বীপে যেতে ন্যাংক্ষদিয়ার কোলঘেঁষে যেতে হয়। মূলত ন্যাংক্ষদিয়া এলাকা থেকেই জেলেদের ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি।
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের ডাংগর পাড়া ও মাঝের পাড়া গ্রামে পাঁচ শতাধিক জেলের বাস। সবারই একমাত্র আয়ের উৎস মাছ ধরা। ডাংগর পাড়া গ্রামের ২৬ বছরের টগবগে যুবক জাহাঙ্গীর আলম। পাঁচ মাস ২৩ দিন মিয়ানমারে আরাকান আর্মির কাছে বন্দি ছিলেন তিনি।
তার ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা করে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমি ও আমার বড় ভাই ইব্রাহীমসহ পাঁচজন জেলে বাংলাদেশের সীমানার কাছে সাগরে মাছ ধরছিলাম। জোয়ারের টানে তাদের জাল মিয়ানমারের সীমানার কাছাকাছি চলে গেলে আরকান আর্মির ৭-৮ জন সশস্ত্র সদস্য একটি ডাবল ইঞ্জিনের হাইস্পিড বোটে এসে তাদের আটক করে। এ সময় তাদের চোখ ও হাত বেঁধে ফেলা হয়।
ধরে নিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদেরও
বাংলাদেশে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের শ্রমিক হিসেবে কম মূল্যে নেওয়া হয় টেকনাফে। বাংলাদেশি জেলেরা নামমাত্র টাকায় রোহিঙ্গাদের শ্রমিক হিসেবে নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। কারণ রোহিঙ্গারা জানে সমুদ্রের কোথায় মাছ বেশি পাওয়া যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশি একজন শ্রমিক এক হাজার টাকা হলে রোহিঙ্গা শ্রমিককে ৫০০-৬০০ টাকায় নেওয়া যায়। ধরে নিয়ে ফেরত দেওয়ার সময় বাংলাদেশিদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদেরও ফেরত দেয় আরাকান আর্মি। এখন পর্যন্ত এমন ৯৪ রোহিঙ্গাকে ফেরত দিয়েছে তারা। এখনও বন্দি ৮৪ জন।
পায়ে শিকল কাজ পাথর টানা, বসানো হতো কোর্ট
জাহাঙ্গীরের ভাই ইব্রাহিম জাগো নিউজকে বলেন, বন্দি করার চারদিন পর থেকে পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়। এই অবস্থায় তাদের দিয়ে পাহাড় থেকে পাথর টানা, পাহাড় পরিষ্কার করা, চাষবাস ও ঘর তৈরির মতো কঠিন কাজ করানো হতো। দূর থেকে পানি টেনে আনার কাজও করতে হতো। করতে না চাইলে করা হতো মারধর।
আটকের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা তাদের কোনো খাবার দেওয়া হয়নি। পরে দিনে দুই বেলা সামান্য ভাত, শুঁটকি মাছ ও সিদ্ধ কলাগাছ খেতে দেওয়া হতো।
৪৫ দিন কাজ করানোর পর তাদের একটি গুদাম ঘরের মতো কারাগারে পাঠানো হয় বলে জানান ইব্রাহিম। ‘তার আগে একজন বিচারক (যিনি কালো কোট ও সাদা শার্ট পরা ছিলেন) কোনো উকিল বা আইনি সহায়তা ছাড়াই ১০ বছরের জেল ঘোষণা করেন। বিচারকের যুক্তি ছিল, তারা বারবার সীমানা অতিক্রম করে মাছ চুরি করতে মিয়ানমারে প্রবেশ করে।’ বলছিলেন আরাকান আর্মির হাতে আটক হওয়া এই জেলে।
জেলখানাটি একটি গুদাম ঘরের মতো ছিল জানিয়ে বলেন, পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। তবে গোসল ও বাথরুমের সুবিধা ছিল। তাদের কাছে থাকা ফোন ও অন্য জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আরকান আর্মির সদস্যরা বলতো, বাংলাদেশ সরকার চাইলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
জাহাঙ্গীর আলমের দুই ছেলেমেয়ে। ছেলের বয়স পাঁচ, মেয়ের এক বছর। প্রায় ৬ মাস বন্দি থাকায় তার স্ত্রীর পক্ষে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। এ সময় জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ৩০ হাজার টাকা ঋণ করেন। গত তিন মাস জাহাঙ্গীর মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। এ কারণে ঋণের টাকাও শোধ করতে পারেননি। প্রতিদিন পাওনাদার তাগাদা দেয়।
গত বছর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ১৭ দিন বন্দি ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী জেলে মাহমুদুল হাসান। তাকে রাখাইন রাজ্যের একটি বিচ্ছিন্ন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। ক্যাম্পটি আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রণ করছিল। মাহমুদুল প্রায় ২০ বছর ধরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মাঝামাঝি জলসীমায় মাছ ধরেন। গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি মাহমুদুল ও তার সঙ্গে থাকা আরও তিনজন অনিচ্ছাকৃতভাবে জোয়ারের কারণে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়েন। উঁচু জোয়ার তাদের জালটি অনেক দূরে নিয়ে যায়। যতই তারা জাল টানার চেষ্টা করছিলেন, ততই একটি সশস্ত্র গ্রুপ কাছাকাছি আসতে থাকে। একটি নৌকায় সশস্ত্র গ্রুপটির সাতজন ছিল, তাদের মধ্যে দুজন অস্ত্রধারী। তারা এসে বাংলাদেশি চার জেলেকে আটক করে নিয়ে যায় দুর্গম পাহাড়ে।
জাগো নিউজকে মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রথমে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করি যে, জোয়ার বাড়ায় আমাদের জাল ভাসতে ভাসতে চলে গেছে, কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শোনেনি। সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর আরাকান আর্মির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বাংলায় আমাদের সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে আসেন। তারা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যাও জানতে চান।
এরপর তারা জানতে চান, বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় কোন কোন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘাঁটি বা অফিস আছে, তারা কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে- এসব।
তথ্য দিতে অস্বীকার করায় তার ওপর নির্যাতন চলে। দুদিন পর মাহমুদুল ও তার অন্য সঙ্গীদের পাহাড়ি এলাকার একটি কারাগারে স্থানান্তর করে আরাকান আর্মি। সেখানে তারা আরও ১৫ দিন বন্দি থেকে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২৮ জন একসঙ্গে মুক্তি পান।
২০ বছর ধরে মৎস্যজীবী হিসেবে কাজ করা মো. শফিউল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের নৌকা যদি সামান্য ভুল করেও তাদের এলাকায় প্রবেশ করে তাহলে আমাদের আটক করে নিয়ে যায়। তারা আমাদের কাছে বাংলাদেশের সীমানায় কোন কোন বাহিনী থাকে, ক্যাম্প কোথায় কোথায়, অস্ত্রশস্ত্র কেমন- এগুলো জানতে চেয়েছিল। না বলতে চাইলে মারধর করতো।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে মালপত্র (খাদ্যপণ্য) আরাকান আর্মির কাছে না গেলে জেলেদের বেশি করে ধরে নিয়ে যায় তারা।
এখনো ফেরেননি অনেকে
১৪ বছর আগে বাবা মারা যান মো. রাসেলের (২৫)। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফেরেননি রাসেল। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। বাবা না থাকায় সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে। পরিবার জানায়, আরাকান আর্মির হাতে আটক রাসেল।
মা মিনারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটা মাত্র পোলা বড়, আর সব ছোড। পাঁচ মাস হয়ে গেলেও পোলাডা আমার ফিরলো না। সংসার চালাইতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করতে হচ্ছে। একবেলা পান্তা ভাত খেলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকা লাগছে।’
রাসেলের মা আরও বলেন, ছেলের জন্য এমপির কাছে গেছি তিনবার, ইউএনওর কাছে দুবার এবং বিজিবির কাছে দুবার। পোলার আইডি কার্ড দিয়ে আসছি। একাই দৌড়াদৌড়ি করা লাগে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর পাঁচজন জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। তাদের মধ্যে রয়েছেন শাহপরীর দ্বীপের ডাংগর পাড়া গ্রামের ইব্রাহিম (১৯)। তার ভাই জুবায়ের জাগো নিউজকে বলেন, ‘৫ মাস হয়ে গেলো ভাইয়ের কোনো খবর নাই। বেঁচে আছে কি না, তাও জানি না। কাগজপত্র নিয়ে অনেক জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সন্ধান মেলেনি।’
বন্দি আছে ১৬৫ জেলে
কক্সবাজার বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিজিবির সহায়তায় এখন পর্যন্ত ২৩৪ জন (বাংলাদেশি ১৪০ ও বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক ৯৪) জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। বর্তমানে আরাকান আর্মির কাছে জেলে আটক আছেন ১৬৫ জন। এর মধ্যে বাংলাদেশি ৮১ জন এবং বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক ৮৪ জন।
আরাকান আর্মির অবস্থান
মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি সে দেশের সীমান্তের দখল নেওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে- জেলে ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা এমনটাই বলছেন। তবে আরাকান আর্মি যে শুধু মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকলে বাধা দিচ্ছে কিংবা আটক করছে, তেমনটা নয়। বাংলাদেশি জেলেদের কেউ কেউ দাবি করছেন, আরাকান আর্মির সদস্যরা বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকেও জেলেদের ধরে নিয়ে গেছে। আরাকানের বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমগুলোতে নাফ নদী কিংবা সাগরে আরাকান আর্মির বিভিন্ন অভিযানের খবর, ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
এরকম কিছু ভিডিও এবং ছবি ঘেঁটে দেখা যায়, আরাকান আর্মির সদস্যরা স্পিডবোটে করে বাংলাদেশের জেলেদের নৌকা ধাওয়া করছে। পরে মিয়ানমারের জলসীমায় অনুপ্রবেশের দায়ে নৌকা ও জেলেদের আটকের ছবি ও ভিডিও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
এরকম কয়েকটি ছবি ও ভিডিওতে যেসব জেলেকে দেখা গেছে, তাদের অনেককেই আবার বাংলাদেশের জেলে বলে শনাক্ত করেছেন স্বজনরা। যেমন, শাহপরীর দ্বীপের পূর্ব দক্ষিণ পাড়ার তাসলিমা জাগো নিজকে বলেন, তিনি আরাকান আর্মির ফেসবুক পেজে নিজের স্বামীর অপহরণের ছবি দেখে চিনতে পারেন। তার স্বামী মনজুর আলমসহ (২৮) চারজনকে গত ১৭ মার্চ ঈদের মাত্র দুদিন আগে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি।
একই গ্রামের জান্নাত আরার ছেলেকেও ধরে নিয়ে যায়। দুদিন কোনো খোঁজ পাননি। এরপর গ্রামের একজন ফেসবুকে জান্নাত আরাকে দেখান তার ছেলেকে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে গেছে, সেই ছবি ফেসবুকে দিয়েছে।
বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আরাকান আর্মির বক্তব্য জানতে তাদের ওয়েবসাইটে থাকা ই-মেইল ও ফেসবুক পেজে গত ৫ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে মেসেজ দিলেও এখন পর্যন্ত তারা কোনো সাড়া দেয়নি।
তবে গত ৯ মে আটক ১৪ জেলেকে ফেরত দেয় আরাকান আর্মি। বিজিবির মধ্যস্থতায় ফেরত আসাদের মধ্যে ১৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক ও একজন রোহিঙ্গা। আরাকান আর্মি দুটি স্পিডবোটে করে বাংলাদেশের সীমানায় এসে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে জেলেদের। এ সময় আরাকান আর্মির কমান্ডার লেফটেন্যান্ট থুয়ে উন জ্য বলেন, ‘সাগরে যদি অবৈধভাবে বাংলাদেশি জেলেরা মাছ ধরে, তাহলে জেলেদের তারা আবারও আটক করবে। জেলেরা যেন অবৈধভাবে সীমানা অতিক্রম না করে।’
তিনি দাবি করেন, আরাকান আর্মি নাফ নদী থেকে কাউকে আটক করে না, যখন বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমারের সীমানায় চলে যায়, তখনই জেলেদের ধরা হয়। বাংলাদেশের মিডিয়া যেন প্রচার করে- তাদের দেশের জেলেরা যেন মিয়ানমারের সীমানায় চুরি করে আর মাছ না ধরে।
হঠাৎ কেন মরিয়া আরাকান আর্মি
আরাকান আর্মির হঠাৎ এমন মরিয়া হয়ে ওঠার কারণ কী- এই প্রশ্নে নিরাপত্তা বাহিনীসংশ্লিষ্ট ও স্থানীয়রা কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করেন।
প্রথমত, মিয়ানমারের সামরিক সরকার বিদ্রোহীদের কাছ থেকে আরাকানের দখল নিতে চেষ্টা করছে। নৌপথে সরকারি বাহিনীর হামলার আশঙ্কায় নদী ও সাগরে কড়া নজরদারি করছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি।
দ্বিতীয়ত, জেলেদের নৌকা আটকের পর লাখ লাখ টাকার মাছ, জাল, খাবার ও অন্য সরঞ্জাম দখল। কারণ আরাকান আর্মি তাদের সরকারের কাছ থেকে কোনো খাবার পায় না, সে কারণে বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে মাছ, খাবার ও অন্য সরঞ্জাম নিয়ে নেয়।
আরাকান আর্মিশাহপরীর দ্বীপের জেটিঘাট/জাগো নিউজ
তৃতীয়ত, জেলেদের আটকের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একধরনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা, ব্যবসা পরিচালনা এবং এর মাধ্যমে এক ধরনের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের পরোক্ষ চেষ্টা করছে আরাকান আর্মি।
টেকনাফের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও এই তৃতীয় ধারণাটি জোরালো হয়েছে গত কয়েক মাসে। যদিও এসব বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাননি।
আরাকান আর্মি আসলে কী চায়?
যেহেতু আরাকান আর্মি জেলেদের ধরে নিয়ে সেখানে দীর্ঘদিন রাখে সেহেতু তারা আসলে কী চায় তার উত্তর জানতে অন্তত ১০ জন জেলের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজ। তারা জানান, প্রায় সময় অবৈধ পথে আরাকান আর্মির জন্য বাংলাদেশ থেকে চাল, ডাল, আলুসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী যায়। যখন যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, তখনই ওরা আমাদের জেলেদের ধরে নিয়ে যায়। তাদের প্রথম শর্ত থাকে খাদ্যসামগ্রী পাঠানো।
বাংলাদেশে আছে আরাকান আর্মির দালাল
শাহপরীর দ্বীপের মাঝের পাড়া বোটমালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুর গফুর জাগো নিউজকে বলেন, ২০২৪ সালের শুরু থেকে আরাকান আর্মি আমাদের জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার শুরু করে।
বাংলাদেশে আরাকান আর্মির দালাল থাকার কথা নিশ্চিত করে গফুর বলেন, বাংলাদেশে যদি দালাল না থাকে তাহলে অপহরণ এভাবে হওয়ার কথা নয়। ধরেন, সন্ধ্যায় বা দিনের বেলা যখন নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছে, তখন দেখা যাচ্ছে- বাংলাদেশের দালাল বলতে যে, অমুক যাচ্ছে নৌকায়, অমুক নৌকায় পাঁচজন যাচ্ছে। কোনো না কোনো কানেকশন আছে।
কক্সবাজার বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের জেলেরা যখনই মিয়ানমার সাইডে যায়, তখনই আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়। এটা প্রকৃতপক্ষে সাগরে, নাফ নদীতে না। এটি নাফ নদীর মোহনা, যেটা সাগরের সঙ্গে মিশেছে।’
অনেক সময় বাংলাদেশের নদীর তথা সাগরের ওই অংশের নাব্য সংকটে ওই পাশে যেতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় মাঝিরা ভুল করেও চলে যায়। যে কারণেই যাক, ওই পাশে গেলে তখন আরাকান আর্মি জেলেদের ধরে নিয়ে যায়। যেহেতু ওরা কোনো ফরমাল ফোর্স না, যাদের সঙ্গে আমাদের ওইভাবে কোনো দ্বিপাক্ষিক কোনো রিলেশন নেই। আমরা আনঅফিসিয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে জেলেদের ফেরত আনি।’
‘ফরমাল রিলেশন থাকলে হয়তো নাব্য সংকটের কারণে ওপারে যেতে পারতো, সেক্ষেত্রে কোনো সমস্যা থাকতো না। যেহেতু ফরমাল রিলেশন নেই, এজন্য আমরা ওদের সঙ্গে এ বিষয়গুলো নিয়ে সেটেল করতে পারছি না।’ বলছিলেন এই কর্মকর্তা।
সমুদ্রে মিয়ানমার সীমান্তে যেতে নেপথ্যে রোহিঙ্গারা
বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী ওই এলাকার দূরত্ব মাত্র প্রায় ৫০০ মিটার। আরাকান এলাকায় এখন যুদ্ধ চলছে। স্থানীয় লোকজন জীবন বাঁচাতেই ব্যস্ত। ফলে সেখানে মাছ ধরার লোক নেই।’
রোহিঙ্গাদের অনেকেই বাংলাদেশে চলে এসেছে জানিয়ে বলেন, ‘তারাই জানে কোন এলাকায় মাছ বেশি পাওয়া যায় এবং বাংলাদেশের জেলেদের সেখানে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করে। অধিকাংশ সময় জেলেরা মাছ ধরে ফিরে আসতে পারলেও কিছু ক্ষেত্রে তারা ধরা পড়ে যাচ্ছেন।’
তবে এখন পর্যন্ত আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি এসে কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেন জিয়াউল হক।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সীমান্ত নির্ধারণ বা জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছি আমরা। জেলেদের ট্রলারে সীমানা নির্ধারণের ডিভাইস দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে, যাতে তারা সীমানা অতিক্রম না করে। মাছ শিকার করা জেলেদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনোভাবেই মিয়ানমারের সীমানায় কেউ চলে না যায়।’
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ক লেখক এবং গবেষক আলতাফ পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আরাকান আর্মি বৈধ না অবৈধ, সেটা আপেক্ষিক ব্যাপার। তারা ওখানকার শক্তি। এদিকে বাংলাদেশ, থার্ড পার্টি সীমান্তের মানুষ এবং চতুর্থ রোহিঙ্গা। আরাকান আর্মি মনে করে তাদের এলাকায় প্রবেশ করলে আটক করার এখতিয়ার তাদের আছে। তাদের সীমানায় গেলে আটক করে, তারা তো বাংলাদেশ থেকে কাউকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে না।’
আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বসা উচিত। কতটুকু ওদের সীমানা এবং কোন জায়গা থেকে ধরছে- এগুলো অবৈধভাবে আলাপ করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সামরিক কূটনীতি বাড়ানো দরকার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আরাকান আর্মির সঙ্গে একটা ইনফরমাল (অনানুষ্ঠানিক) যোগাযোগ নিশ্চয়ই আছে। এই যোগাযোগটাকে কার্যকর যোগাযোগ করা দরকার। কারণ আরাকান আর্মি যে জিনিসগুলা করছে তা খুবই অন্যায়। বাংলাদেশ একটা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার কারণেই আরাকান আর্মি এতটা শক্তিশালী হতে পারছে।’
ব্যাপারটা খুব ‘স্পর্শকাতর’ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে জান্তা সরকারের সঙ্গেও বাংলাদেশের একটা সংকট আছে, আবার আরাকান আর্মির সঙ্গেও সংকট আছে। আবার এটাও সত্যি কথা যে, এই আরাকান আর্মি হোক আর জান্তাই হোক- এরা সভ্য আচরণ করে না।’
অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, ‘এজন্য আমাদের সামরিক কূটনীতি আরও জোরদার করা উচিত। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। তাদের কার্যকর সিগন্যাল দেওয়া দরকার যে বাংলাদেশ এটা গ্রহণ করবে না।’
সমাধান কোন পথে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ড. আবু হেনা মুহাম্মদ ইউসুফ জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রথমে জিপিএস সিস্টেমের মাধ্যমে জেলেদের ট্রেনিং দেওয়া যেতে পারে। যেহেতু এখন সবাই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, তাই নিশ্চিত করা দরকার যাতে জেলেরা বর্ডার লাইনটা কোনোভাবেই ক্রস না করে।’
স্বামীকে আটক করে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি, সন্তান কোলে অসহায় তাসলিমাস্বামীকে আটক করে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি, সন্তান কোলে অসহায় তাসলিমা/জাগো নিউজ
‘দ্বিতীয়ত- আমার দেশটা বাংলাদেশ না হয়ে যদি ইউএসএ হতো, তাহলে মিয়ানমার যখন-তখন জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার সাহস পেতো না। তার মানে জিও-পলিটিক্স। আমরা যেহেতু গরিব দেশ, আমাদের সেই পরিমাণ সক্ষমতা নেই। যে কারণে তারা আমাদের সঙ্গে এ ধরনের ব্যবহার করার দুঃসাহস দেখায়।’ বলছিলেন ড. আবু হেনা
সেক্ষেত্রে আমাদের একসঙ্গে দুটো কাজ করতে হবে জানিয়ে বলেন, ‘প্রথমত তাদের সঙ্গে সুন্দর একটি ফ্রেন্ডলি রিলেশনশিপ এস্টাব্লিশ করা। একই সঙ্গে আমাদের বর্ডার ফোর্সকে আরও অ্যাকটিভ করা। তাদের সেরকমভাবে পেট্রোলিং করার সব সাপোর্ট দেওয়া, যাতে ওই ধরনের কোনো অ্যাকশনে যাওয়ার আগেই বর্ডার গার্ড সেখানে আমাদের জেলেদের সেভ করতে পারে। এছাড়া সমুদ্রে বয়া সিস্টেম করে আমাদের সীমানার পিলারটা দেখিয়ে দেওয়া যেতে পারে।’
যা বলছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. তৌফিক-উর-রহমান জাগো নিউজকে বলেন, “আরাকান আর্মি একটি ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’। ফলে বিষয়টি সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। একই কারণে বাংলাদেশি মিশনেরও ওই এলাকায় সরাসরি কোনো প্রবেশাধিকার বা কার্যকর উপস্থিতি নেই।”
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ের যোগাযোগ ও অনানুষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমেই বিষয়গুলো সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয় জানিয়ে বলেন, ‘এক্ষেত্রে সীমান্ত এলাকার বিজিবি বা কোস্টগার্ডের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ধরনের বোঝাপড়া বা যোগাযোগ থাকতে পারে। তবে এজন্য কোনো আনুষ্ঠানিক বা প্রতিষ্ঠিত চ্যানেল নেই।’
নদীসীমা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সমুদ্রসীমা ও নদীসীমা নির্ধারণের পদ্ধতি এক নয়। নদীর ক্ষেত্রে সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন আনক্লোজের নিয়ম সরাসরি প্রযোজ্য হয় না। সাধারণভাবে দুই দেশের মধ্যে নদীসীমা নির্ধারণে নদীর মাঝখানের প্রবাহরেখা বা মিডস্ট্রিম অনুসরণ করা হয়। তবে নাফ নদীর মতো এলাকাগুলোতে বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো সীমারেখা টানা সম্ভব হয় না।’ - জাগো
