রাজনৈতিক বংশতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ছেন শামসুল হক
আজকাল রিপোর্ট
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৭:৩০ পিএম, ২২ মে ২০২৬ শুক্রবার
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শামসুল হক এমন এক 'রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত' প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়ছেন, যিনি কুইন্স ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ও সাবেক প্রভাবশালী কংগ্রেসম্যান জোসেফ ক্রাউলির নেফিউ এবং নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের দীর্ঘদিনের চিফ অফ স্টাফ র্যামন মার্টিনেজের ছেলে। বাংলাদেশি আমেরিকান শামসুল হক ৩০তম অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি কঠোর পরিশ্রম করছেন। নির্বাচনী আপসেট তৈরি করে জয়ী হতে পারেন শামসুল হক। ২০ বছর একতরফা কংগ্রেসম্যান হিসেবে এই এস্টোরিয়া , উডসাইড ও জ্যাকসন হাইটস এলাকা থেকে নির্বাচিত হতেন মার্টিনেজের আত্মীয় জোসেফ ক্রাউলী। কিন্তু রাজনীতিতে একেবারে নতুন রেষ্টুরেন্টের ওয়েটার থেকে উঠে আসা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্টেজের কাছে ২০১৮ সালে ৮ বছর আগে তিনি হেরে যান। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ইতিহাসে এটা ছিল বড় আপসেট। নির্বাচনের আগের দিনও কেউ ভাবতে পারেননি ওকাসিও জিতবেন। এমনই একটি ঝড়ের সম্ভাবনা অনেকেই দেখছেন এসেমব্লি ডিস্ট্রিক্ট ৩০-এ। শামসুলের তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচনী দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। এই ডিস্ট্রিক্টের অভিবাসী সম্প্রদায় তার ওপর আস্থা রাখছে-তারা তাকে এমন একজন অ্যাসেম্বলিম্যান হিসেবে দেখতে চায়, যিনি ভবিষ্যতে তাদের নেতৃত্ব দেবেন এবং আলবেনিতে (রাজ্য বিধানসভায়) তাদের স্বার্থ রক্ষায় লড়াই করবেন। ৩০তম অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্টের আওতাভুক্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে উডসাইড, মাসপেথ, এলমহার্স্ট এবং ইস্ট এলমার্স্ট ও জ্যাকসন হাইটসের কিছু অংশ।
নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের বাংলাদেশি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শামসুল হকই প্রথম এসেমব্লি কোনো পদে লড়ছেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ধনীদের ওপর কর আরোপ, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফি বা শিক্ষার খরচ সম্পূর্ণ মওকুফ করার মতো এজেন্ডা নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।
'বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন'-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শামসুল হক গত বছর অবসরে যাওয়ার আগে পুলিশ বিভাগে মোট ২১ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। যার মধ্যে এক দশক কেটেছে 'অভ্যন্তরীণ তদন্ত বিভাগে' । জোহরান মামদানির মেয়র নির্বাচনী প্রচারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তার একজন বিশিষ্ট সমর্থক হয়ে ওঠেন এবং অন্যান্য মুসলিম পুলিশ কর্মকর্তাদের মামদানিকে ভোট দিতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মামদানি নির্বাচনে জয়লাভ করার পর শামসুল হক মেয়রের 'কমিউনিটি সেফটি ট্রানজিশন কমিটি'তে দায়িত্ব পালন করেন।
এই নির্বাচনে যেসব প্রার্থী 'ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকা' (ডিএসএ) সংগঠনের সমর্থন নিয়ে লড়ছেন, শামসুল হকের নির্বাচনী এজেন্ডাও অনেকটা তাদের মতোই। শামসুল হক নিজে ডিএসএ এর কোনো সদস্য নন; তবে বিস্ময়করভাবে, ডিএসএ এর অন্যতম শীর্ষ নেতা, প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স তাকে সমর্থন জানিয়েছেন। শামসুল হক এই সংগঠনটির বেশ কিছু অর্থনৈতিক প্রস্তাবকে সমর্থন করেন-বিশেষ করে নিউ ইয়র্কবাসীদের মধ্যে যারা বছরে ১০ লক্ষ ডলারের বেশি আয় করেন, তাদের ওপর আয়কর বৃদ্ধি; সবার জন্য বিনামূল্যে শিশুযত্ন ব্যবস্থা এবং কিউনি (সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক)-তে বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, "মেয়র ধনীদের ওপর কর আরোপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং আমিও ঠিক একই মতাদর্শে বিশ্বাসী।" তিনি আরও বলেন, "তারা যেমন শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়, আমিও ঠিক তাই চাই; কারণ আমিও তো সেই শ্রমজীবী শ্রেণি থেকেই উঠে এসেছি।"
অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে শামসুল হকের এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশি-আমেরিকান সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও গুরুত্বকে যাচাই করার একটি সুযোগ হিসেবে কাজ করবে। উল্লেখ্য যে, নিউ ইয়র্ক সিটিতে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলাদেশি-আমেরিকানরাই সংখ্যায় বৃহত্তম এবং এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল সম্প্রদায়। হক যদি জয়লাভ করেন, তবে তিনি হবেন প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান যিনি স্টেটের আইনসভায় দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর হিসাব মতে, এই নির্বাচনী এলাকায় প্রায় ৪,০০০ বাংলাদেশি-আমেরিকান ভোটার রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ৩,০০০-এরও বেশি ভোটার ডেমোক্র্যাট হিসেবে নিবন্ধিত।
হক নিজেকে 'আমেরিকান স্বপ্নের' (অসবৎরপধহ উৎবধস) মূর্ত প্রতীক হিসেবে দেখেন। "আমার নির্বাচনে দাঁড়ানোর অন্যতম কারণ হলো, এই শহর আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে; আর তাই আমি এই শহরের প্রতি আমার ঋণ শোধ করতে চাই," তিনি 'সিটি অ্যান্ড স্টেট' (ঈরঃু ্ ঝঃধঃব)-কে কতঅ বলেছেন। তিনি বলেন, "প্রায় ৩৫ বছর আগে মাত্র ২০০ ডলার পকেটে নিয়ে আমি আমেরিকায় এসেছিলাম। তখন আমি ঠিকমতো ইংরেজিও বলতে পারতাম না। আমি দোকানের কর্মী, বাসবয়, থালা-বাসন ধোয়ার কর্মী এবং ডেলিভারি কর্মী হিসেবে কাজ করেছি-এক কথায়, টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে গেছি। কিন্তু এরপরই নিউ ইয়র্ক আমার জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।"
একটি জিইডি ডিপ্লোমা অর্জনের পর তিনি লাগুয়ার্ডিয়া কমিউনিটি কলেজ থেকে একটি 'অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি' এবং বারুখ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি সমগ্র 'কিউনি' ছাত্র সংসদের প্রধান নির্বাচিত হন এবং কিউনি-র বোর্ড অফ ট্রাস্টিতে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন; সেখানে তিনি টিউশন ফি বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখেন। ৯/১১-এর হামলার পরবর্তী সময়ে, হক নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগে যোগ দেন-যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল তাঁর এই নতুন মাতৃভূমির প্রতি নিজের আনুগত্য প্রমাণ করা। অভ্যন্তরীণ তদন্ত ব্যুরোতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি বছরের পর বছর ধরে একজন টহল কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করেন। অভ্যন্তরীণ ব্যুরোতে তিনি পুলিশি বলপ্রয়োগ এবং অসদাচরণ সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর তদন্ত করতেন।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ২৩শে জুন। এই প্রাথমিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী তিনজন প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন শামসুল হক, প্যাট্রিক মার্টিনেজ এবং সোমনাথ ঘিমির।
প্যাট্রিক মার্টিনেজ ২০২২ সাল থেকে ডেমোক্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট নেতা হিসেবে এবং গত পাঁচ বছর ধরে 'কুইন্স কমিউনিটি বোর্ড ২'-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পেশায় ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বিক্রয়কর্মী মার্টিনেজ বর্তমানে উডসাইড এলাকায় বসবাস করেন। ঐতিহ্যবাহী এক রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য তিনি।
নির্বাচনী প্রচারণার একজন মুখপাত্র 'সিটি অ্যান্ড স্টেট'কে নিশ্চিত করেছেন যে, প্যাট্রিক মার্টিনেজ হলেন কুইন্স ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাবেক নেতা ও কংগেস্খসম্যান জো ক্রাউলির ভাগ্নে এবং নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের দীর্ঘদিনের 'চিফ অফ স্টাফ' র্যামন মার্টিনেজের ছেলে। প্রবীণ মার্টিনেজ সিটি কাউন্সিলের সাবেক স্পিকার মেলিসা মার্ক-ভিভেরিতো এবং ক্রিস্টিন কুইনের অধীনে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্যাট্রিক মার্টিনেজের ভাই কনর নিউ ইয়র্ক সিটির সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের একজন শীর্ষস্থানীয় 'আন্তঃসরকারি সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা' হিসেবে কাজ করেছিলেন। তাঁদের এক কাজিন, এলিজাবেথ ক্রাউলিও সিটি কাউন্সিলে কুইন্সের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর বাবা-মা উভয়েরই পাবলিক সার্ভেন্ট অফিসে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। নেপালি-আমেরিকান কমিউনিটি নেতা সোমনাথ ঘিমিরে কুইন্সের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৩০তম অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট থেকে নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতেও লড়ছেন।
