রামিসা ধর্ষণ ও হত্যায় তোলপাড় বাংলাদেশ
মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৭:২৩ পিএম, ২২ মে ২০২৬ শুক্রবার
দ্রুত বিচারের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে তাদের পাশের বাসায় আটকে রেখে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পুরো দেশে তোলপাড় চলছে। আদালতে দোষ স্বীকার করে আসামী রানা জানায়, দেড় মাস আগে নাটোর কারাগার থেকে জামিন পেয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় রামিসাদের পাশের বাসায় এসে উঠে। জেলখাটা এই অপরাধি রামিসাকে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে মাথা কেটে হত্যার ঘটনায় সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে। থানা ঘেরাও, চলছে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, মশাল মিছিল। সারাদেশে এই নৃশংসতায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার পল্লবীতে নিহত রামিসার বাসায় যান। তিনি শিশুটির বাবা-মা এবং বড় বোনকে সাত্ত্বনা দেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেন, ‘এই মুহূর্তে প্রধান কাজ হলো বিচার নিশ্চিত করা’। এ সময় উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘২৪ ঘন্টার মধ্যে এই ঘটনার চার্জশিট হবে’।
পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন একটি ভবনে মঙ্গলবার সকালে এই হত্যাকান্ড ঘটে। নিহত রামিসা আক্তার স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলো। গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সে স্কুলের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। রামিসাদের পাশের ফ্ল্যাটেই সাবলেট ভাড়াটে হিসাবে থাকতো মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা (৩০) এবং তার স্ত্রী স্বপ্ন আক্তার। পুলিশ ও মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রামিসা ঘর থেকে বের হওয়ার পর সোহেল রানা ও তার এক সহযোগি তাকে জোরপূর্বক তাদের ঘরে নিয়ে যায়। শিশুটি চিৎকার করতে চাইলে ওড়না দিয়ে তার মুখ বেঁধে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পর এক পর্যায়ে রামিসা অচেতন হয়ে পড়লে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
ধর্ষণের প্রমাণ ও অপরাধ লুকাতে সোহেল রানা অত্যন্ত বর্বর পথ বেছে নেয়। রামিসার মরদেহ টুকরো টুকরো করে ব্যাগে ভরে গুম করার পরিকল্পনা ছিল তার। সে রামিসার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং হাত কাটার চেষ্টা করে। রামিসার মস্তকবিহীন দেহটি খাটের নীচে এবং বিচ্ছিন্ন মাথাটি বাথরুমে একটি বালতির ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। রক্তাক্ত ছিল পুরো ঘর।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তার খোঁজে বের হন। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে প্রতিবেশি সোহেল রানার দরজার বাইরে রামিসার একটি জুতা দেখতে পান তিনি। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় এবং বারবার ডাকার পরও সাড়া না পাওয়ায় তার সন্দেহ হয়। তিনি প্রতিবেশিদের ডেকে জড়ো করেন। বাইরে লোকজনের চিৎকার ও হট্টগোল শুনে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নার ঘুম ভাঙে। সোহেল তখন জানালা কেটে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
স্থানীয়রা দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে সোহেল জানালা কেটে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে স্থানীয়রা আটকে রেখে পুলিশে খবর দেয়। ঘরে ঢুকে খাটের নীচে রামিসার রক্তাক্ত মস্তকবিহীন দেহ আবিস্কার করা হয়।
ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত তৎপরতা শুরু করে। প্রায় সাত ঘন্টার একটি বিশেষ অভিযানের পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নারায়নগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ঘটনাস্থল থেকে তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করা হয়েছিল।
বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোহেল রানা নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। আদালত তাকে ও তার স্ত্রীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এই ঘটনায় রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার তীব্রতায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান ডিএমপি কমিশনারকে এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সমাজ কল্যাণমন্ত্রী অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পল্লবীতে রামিসার পরিবারের বাসভবনে যান। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এই জঘন্য অপরাধের জন্য দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। এই পাশবিক হত্যাকান্ডের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং অপরাধীদের দ্রুত ফাঁসির দাবি জানানো হচ্ছে।
