শনিবার   ১৬ মে ২০২৬   জ্যৈষ্ঠ ১ ১৪৩৩   ২৯ জ্বিলকদ ১৪৪৭

চীন-ভারতের চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ

মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:০৯ এএম, ১৬ মে ২০২৬ শনিবার



দিল্লি ও বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ভারসাম্য রক্ষাকে ‘টাইটরোপ’ দিয়ে বোঝানো যায়। টাইটরোপ কথাটার অর্থ হলো, দুই পাহাড়ের মাঝে সরু সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মোটেও ‘জিরো সাম গেইম’ নয়। তার মানে হলো, উভয়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা। এ এক কঠিন দ্বৈরথ! এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম বিদেশ সফর ভারত না-কি চীন হবে সেদিকে সবাই তাকিয়ে আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি ভারত ও চীন উভয় দেশ সফর করেছেন। বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ সরণ সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরণ পর্যবেক্ষণ করছে ভারত।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, ‘কৌশলগত ভারসাম্য’। আর এই ভারসাম্যের খেলায় সবচেয়ে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। একদিকে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বন্ধু রাষ্ট্র ভারত, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রধান অংশীদার চীন। এই দুই শক্তির মাঝখানে নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে চলাটা যেন অনেকটা এক সরু সুতোর ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো চ্যালেজিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতের সাথে ঢাকার সম্পর্ক অনেকটা অ¯ি’ত্বের সাথে মিশে আছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা, ট্রানজিট সুবিধা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতার জন্য ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক অপরিহার্য। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ¦ালানী খাতে ভারতের বড় বিনিয়োগ ও আদানি গ্রুপের সাথে চুক্তির মতো বিষয়গুলো ভারতকে ঢাকার খুব কাছাকাছি  রেখেছে। তবে তিস্তা পানি বন্টন ইস্যু ও সীমান্ত হত্যার মতো অমীমাংসিত সমস্যাগুলো জনমনে মাঝে মাঝে অস্বস্তি তৈরী করে। বিশেষ করে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছিলো। ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে সেটাকে কেউ কেউ দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে উল্লেখ করেন। তারা ভারতকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালান। ইউনূস সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে উদ্যোগী হলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি হয়। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাসহ সরকার ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ ভারতকে চিকেনস নেক থেকে আলাদা করা কিংবা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টার্সকে পৃথক করার হুমকি দিলে দুই প্রতিবেশি দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হয় এবং ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসনের লক্ষ্যে ভারতবিরোধী কাউকে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে না দেবার অঙ্গীকার করে। এতে আশ্বস্ত হয়ে ভারতও সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হয়।
এদিকে, চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়ক হচ্ছে। পদ্মা সেতু প্রযুক্তিগত সহায়তা, কর্ণফুলী টানেল এবং পায়রা বন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে চীনের বিশাল ঋণ ঢাকাকে বেইজিংয়ের দিকে টানছে। সস্তা ও সহজলভ্য ঋণ বাংলাদেশকে চীনের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে যা দিল্লির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। ভারতের ভয়- বাংলাদেশ যদি চীনের ঋণের ফাঁদে পড়ে যায় তবে বঙ্গপোসাগরে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য হুমকির মুখে পড়বে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে জ¦ালানী কৌশলগত সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে তা এই দ্বৈরথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশ এখন শুধু ভারত বা চীনের ওপর নির্ভর না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সুপার পাওয়ারকে নিজের জ¦ালানী অংশীদার হিসাবে পাশে পাচ্ছে। এটি ঢাকাকে ভারত ও চীনের চাপের মুখে কিছুটা নিঃস্বাস নেওয়ার জায়গা করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি - সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরীতা নয়। ঢাকা এখন পর্যন্ত অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে এই নীতি মেনে চলছে। বেইজিং থেকে সাবমেরিন কিনেছে আবার দিল্লিকে ডিরেক্ট ট্রানজিট দিচ্ছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা আসছে তখন, যখন এই দেশ একে অপরের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বা গভীরসমুদ্র বন্দর নির্মাণের ক্ষেত্রে ঢাকাকে বারবার কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য ভারত বা চীন কাউকেই ছেড়ে তেওয়া সম্ভব নয়। ভারতের সঙ্গে প্রয়োজন স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা, আর চীনের সঙ্গে প্রয়োজন টেকসই উন্নয়ন ও বিনিয়োগ। এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা যতটা কঠিন, ততটাই প্রয়োজনীয়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি এই ‘টাইটরোপ’ বা সরু সুতোর ওপর দিয়ে সফলভাবে হেঁটে যেতে পারে, তবে আগামী দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এক অপরাজেয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। কিন্তু সামান্য বিচ্যুতি বা কোনও এক দিকে বেশি ঝুঁকে পড়া দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে। ঢাকার কূটনীতি এখন আর কেবল দ্বিপক্ষীয় নয়, এটি এখন একটি বহুমাত্রিক দাবার চাল, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে অতি সাবধানে।