হাম ওয়ার্ডে ধুঁকছে শিশু বাড়ছে মৃত্যু, আহাজারি
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৭:৩৩ এএম, ১৩ মে ২০২৬ বুধবার
হুমায়ুন-লিজা দম্পতির একমাত্র সন্তান আরিয়া মণি। তার বয়স পাঁচ মাস। হামে আক্রান্ত হওয়ায় গত সোমবার তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। কিন্তু শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সে মারা গেছে। একমাত্র সন্তানের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েন হুমায়ুন ও লিজা। তাদের আহাজারিতে হাসপাতালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয়।
মমেক হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে এমন ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যু বাড়ছে। সন্তান নিয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে মা-বাবার। শয্যা সংকটে মেঝেতে রেখে চলছে চিকিৎসা। মিলছে না সরকারি ওষুধ। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকায় অর্থ সংকটে অনেক অভিভাবক। চিকিৎসার এমন অব্যবস্থাপনার কারণে সন্তান নিয়ে হাসপাতালে আসা মা-বাবার দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, চলতি বছর মমেক হাসপাতালে হামে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০-এ। গত সোমবার সাত মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়। তার বাড়ি মুক্তাগাছা উপজেলায়। রোববার রাতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার বিকেলে সে মারা যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটি হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় ভুগছিল।
মেঝেতে চলছে চিকিৎসা
গতকাল দুপুরে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে দেখা যায়, তিল ধারণের জায়গা নেই। ফুলবাড়িয়া উপজেলার সলিবাজার এলাকা থেকে আসা মারাবিয়া খাতুন তাঁর ছয় মাসের সন্তান রাব্বিকে নিয়ে বারান্দায় পায়চারি করছেন। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট আর ১০৩ ডিগ্রি জ্বরে ছটফট করছে শিশুটি।
মারাবিয়া জানান, সোমবার দুপুরে তাকে ভর্তি করা হলেও সিট পাননি। ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে। একই অবস্থা ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের ইব্রাহিম ভূঁইয়ার। আড়াই বছরের সন্তানকে নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালের মেঝেতে বসে সেবা করছিলেন তিনি ও তাঁর স্ত্রী।
সংক্রমণের ঝুঁকি
হাসপাতালের প্রতিটি কোনায় এখন সংক্রমণের ভয়। ঈশ্বরগঞ্জের ইব্রাহিম ভূঁইয়া জানান, তিনি ভালুকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তাঁর আড়াই বছরের ছেলে ইয়ামিন ভর্তি রয়েছেন। তবে তিন বছরের বড় ছেলেকে রাখার জায়গা নেই। ফলে তাকেও হাম আক্রান্ত ছোট সন্তানের সঙ্গে একই বিছানায় থাকতে হচ্ছে।
ইয়ামিনের মা আকলিমা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সোমবার বিকেলে ভর্তি করা হলেও মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত কোনো বড় চিকিৎসক (বিশেষজ্ঞ) তাদের শিশুকে দেখতে আসেননি।
দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৬ জন হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৮ শিশু। বর্তমানে বিশেষায়িত ওয়ার্ডগুলোতে মোট ৯৬ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। এ ইউনিটের শয্যাসংখ্যা মাত্র ৬৪। গত ১৭ মার্চ এ পর্যন্ত মোট এক হাজার ২৭০ শিশু ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এক হাজার ১৪৫ জন।
ডা. মাইনউদ্দিন বলেন, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, শিশুদের সুরক্ষায় নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শরীরে জ্বরের সঙ্গে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
