মঙ্গলবার   ১২ মে ২০২৬   বৈশাখ ২৮ ১৪৩৩   ২৫ জ্বিলকদ ১৪৪৭

হামে কেন এত মৃত্যু

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৭:০১ এএম, ১২ মে ২০২৬ মঙ্গলবার

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে শিশুমৃত্যুর মিছিল। গতকালও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে সরকারি হিসাবেই হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪১৫ শিশু। হামে এত মৃত্যুর কারণ হিসেবে টিকাদানে ঘাটতি, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল না পাওয়া, অপুষ্টিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে টিকা ক্যাম্পেইন সফল হলে মে মাসের শেষ কিংবা জুনের প্রথম দিকে হাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘করোনা মহামারিজনিত টিকাদান কার্যক্রম বিঘ্নের কারণে সৃষ্ট রোগ প্রতিরোধ ঘাটতি (ইমিউনিটি গ্যাপ) হামের সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে নিউমোনিয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো এলাকায় টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে সেখানে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।’ হাম মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসেবে আক্রান্ত শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক ভিটামিন ‘এ’ এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া। পাশাপাশি শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত জ্বর, খেতে না পারা কিংবা তীব্র ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪১৫।  আরও জানা যায়, হামে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ৬৫ আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৫০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে তিনজন, চট্টগ্রামে দুজন ও ময়মনসিংহে একজন মারা গেছে। এ সময় সারা দেশে হামে আক্রান্ত হয়েছে ১১৮ শিশু। এ নিয়ে মোট হাম আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৯৩৭ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন ১ হাজার ৩৪১ শিশুর সংক্রমণ রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৫০০ জনে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হামে মৃত্যুর ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মৃতদের অনেকেরই টিকা নেওয়া ছিল না, তারা মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছিল এবং তাদের অন্যান্য শারীরিক জটিলতা ছিল। ডেথ রিভিউ করলে আরও বিস্তারিত কারণ জানা যাবে। তবে ছয় মাসের কম বয়সি শিশুরা কেন আক্রান্ত হচ্ছে সে বিষয়ে গবেষণা খুব জরুরি। বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির সুযোগ দিতে ২০২৪ সালের নির্ধারিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিটি যদি সময়মতো পালন করা হতো, তবে হয়তো এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। তিনি আরও বলেন, টিকা দেওয়ার পর শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে অন্তত চার-ছয় সপ্তাহ সময় লাগে। সংক্রমণের উচ্চহারের কারণে যে ৩০ উপজেলায় প্রথমে টিকাদান শুরু হয়েছিল, সেখানে এখন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। তাই মে মাসের শেষ দিকে বা জুনের শুরুতে সংক্রমণের হার কমবে বলে আশা করা যায়। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-রুবেলা টিকাদান সমন্বয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮৯ হাজার ৬৭১ জন শিশু হাম-রুবেলার টিকা গ্রহণ করেছে। সারা দেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে এ কার্যক্রমের আওতায় টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এতে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ পূরণ হয়েছে। বিভাগভিত্তিক টিকা গ্রহণকারী শিশুর সংখ্যা হিসেবে বরিশালে ১০ লাখ ৪৭ হাজার ২২১ জন, চট্টগ্রামে ৪২ লাখ ৬৮ হাজার ২৯, ঢাকায় ৪৪ লাখ ৬০ হাজার ৮২০, খুলনায় ১৬ লাখ ২ হাজার ৪১৯, ময়মনসিংহে ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪২৪, রাজশাহীতে ২০ লাখ ৯০ হাজার ২৮৯, রংপুরে ১৯ লাখ ১৭ হাজার ৩৫১ এবং সিলেটে ১২ লাখ ৮০ হাজার ৪২৩ জন। গতকাল বরিশালে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, যাদের টিকা দেওয়া হয়েছে তাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা তৈরি হতে চার সপ্তাহ সময় লাগবে। তারপর হাম পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।