সোমবার   ১১ মে ২০২৬   বৈশাখ ২৭ ১৪৩৩   ২৪ জ্বিলকদ ১৪৪৭

পয়ঃবর্জ্য নেই, ঝিলের পানি শোধন করেই চলছে দাশেরকান্দি এসটিপি

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:১৭ এএম, ১১ মে ২০২৬ সোমবার

  •  উদ্বোধন ২০২৩ সালের ১৩ জুন
  •     ২০২৬ সাল পর্যন্ত পয়ঃসংযোগই নির্মাণ করা হয়নি
  •     হাতিরঝিলের পয়ঃবর্জ্য শোধনে খুঁড়িয়ে চলছে এসটিপি

এখন ঢাকা শহরে দিনে দুই হাজার মিলিয়ন লিটার পয়ঃবর্জ্য উৎপন্ন হয়। যার শতভাগ ড্রেনে গড়িয়ে সরাসরি লেক, খাল, নদীতে গিয়ে পড়ছে। এতে চরমভাবে দূষিত হচ্ছে ঢাকার পরিবেশ।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিন বছর আগে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দাশেরকান্দিতে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপন করেছিল ওয়াসা। তখন বলা হয়েছিল, এসটিপির মাধ্যমে ঢাকার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পয়ঃবর্জ্য শোধন করা হবে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখন পর্যন্ত ওই এসটিপি পয়ঃবর্জ্য সংযোগ তৈরি করতে পারেনি ওয়াসা। অর্থাৎ, বাসা-বাড়ি থেকে পয়ঃবর্জ্য সংগ্রহের ‘স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইন’ তৈরি না করেই প্ল্যান্টটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। তখন এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ খান। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে।

ওয়াসার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশ দূষণ রোধ ও ঢাকার চারপাশের নদীর পানির গুণগত মান উন্নয়নে এসটিপির পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিতে স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইন নির্মাণের বিকল্প নেই। এজন্য আরও তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন আরেকটি প্রকল্প নিতে হবে। এ কাজে বিদেশি বিনিয়োগের আশায় দিন গুনছে ঢাকা ওয়াসা।

ওই অর্থায়ন হলে এসটিপির সঙ্গে তেজগাঁও, নিকেতন, বাড্ডা, বনানী, গুলশান (অংশ), রমনা, ইস্কাটন, নয়াটোলা, মগবাজার, ওয়্যারলেস, মৌচাক, আউটার সার্কুলার রোড, মহানগর হাউজিং, হাতিরঝিল, কলাবাগান ও ধানমন্ডির (আংশিক) পয়ঃবর্জ্যের পাইপলাইন তৈরি করা হবে। কিন্তু কবে নাগাদ এ বিনিয়োগ পাওয়া যাবে, তার সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে পারছে না ওয়াসা।

উদ্বোধনের তিন বছর পর এসটিপির ব্যবহার নিয়ে জানা যায় ভিন্ন এক তথ্য। ওয়াসা সূত্র জানায়, স্টর্ম স্যুয়ারেজে পয়ঃবর্জ্য না পেয়ে এসটিপি সচলে ভিন্ন এক পদ্ধতি ব্যবহার করছে ওয়াসা। সংস্থাটি হাতিরঝিল থেকে ময়লা পানির একাংশ টেনে এসটিপিতে পরিশোধন করছে। পরে সে পানি আবার রামপুরা খালে ফেলছে। এতে খালের পানির মান কিছুটা উন্নতি ঘটছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম একক পয়ঃশোধনাগার এসটিপি স্থাপন করা হয়েছে, তার সুফল মিলছে না।

    এই ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টটা যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, এখন কিন্তু তার কিছুই হচ্ছে না। অথচ শতভাগ নেটওয়ার্ক থাকবে এমন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে এ প্রকল্পটি হাতিরঝিলের সঙ্গে ইন্টিগ্রেটেড করা হয়েছিল।-বাপার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য স্থপতি ইকবাল হাবিব

পরিবেশবিদদের ভাষ্য, ওয়াসা এসটিপি স্থাপন ও স্টর্ম স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক বা সংযোগ প্রকল্প একসঙ্গে করার দরকার ছিল। এটি করা হলে এখন এসটিপিকে খুঁড়িয়ে চলতে হতো না। তাই যত দ্রুত সম্ভব এসটিপির সংযোগগুলো নির্মাণ করতে হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য স্থপতি ইকবাল হাবিব জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টটা যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, এখন কিন্তু তার কিছুই হচ্ছে না। অথচ শতভাগ নেটওয়ার্ক থাকবে এমন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে এ প্রকল্পটি হাতিরঝিলের সঙ্গে ইন্টিগ্রেটেড করা হয়েছিল।

এখন হাতিরঝিলকে কেন্দ্র করে প্ল্যান্টটি বসে আছে জানিয়ে বলেন, ‘আমি মনে করি, দ্রুত পুরো মাস্টারপ্ল্যানটি শেষ করা উচিত। আর যাদের জন্য এ কাজে বিলম্ব হলো, বিলম্বের কারণে মানুষের দুর্ভোগ, জন-জল-জমি-বায়ুর দূষণ হলো তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

২০২৩ সালের ১৩ জুন দাশেরকান্দিতে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম একক পয়ঃশোধনাগার এসটিপির কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ৬২ একর জমির ওপর তিন হাজার ৪৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে এসটিপি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি তহবিল থেকে আসে এক হাজার ১০৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ঢাকা ওয়াসা থেকে এসেছে ১০ কোটি টাকা। চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে আসে দুই হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।

প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাকসিম এ খান বলেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকায় উৎপাদিত পয়ঃবর্জ্য শতভাগ পরিশোধনের জন্য নারায়ণগঞ্জের পাগলা, ঢাকার রায়েরবাজার, উত্তরা ও মিরপুরে আরও চারটি আধুনিক সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) নির্মাণ করা হবে।


রামপুরা ব্রিজ থেকে দাশেরকান্দির দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, রামপুরা ব্রিজ সংলগ্ন হাতিরঝিলের ভেতর রয়েছে ওয়াসার পাম্প। এখান থেকে পাম্পের সাহায্যে ময়লা পানি টেনে দাশেরকান্দি নেয় ওয়াসা। পরে প্ল্যান্টের ভেতর কয়েক স্তরে পানি থেকে ময়লা আলাদা করা হচ্ছে। আর পানি বড় নালা দিয়ে ফেলা হচ্ছে রামপুরা খালে।

    উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য হাতিরঝিলের উভয় পাশের বিদ্যমান ডাইভার্টেড স্যুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে দাশেরকান্দিতে এসটিপিতে নিয়ে পরিশোধন করা হচ্ছে। যা এর আগে সরাসরি রামপুরা খালে নিষ্কাশিত হতো। বর্তমানে পয়ঃবর্জ্য লাইন নির্মাণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। আশা করি দ্রুত শুরু হবে।-ওয়াসার জনসংযোগ কর্মকর্তা আব্দুল কাদের

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াসার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘এসটিপি ও সংযোগ লাইন আলাদা দুটি প্রকল্প ছিল। এর মধ্যে এসটিপি প্রথমে স্থাপন করা হয়েছে। এখন সংযোগ লাইন স্থাপনে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগের তালাশ করছে ওয়াসা। এর মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংক ওয়াসার প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে।’

তিনি বলেন, সংযোগ তৈরিতে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা দরকার। ওই অর্থায়ন নিশ্চিত হলে শহরের বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য একটি নির্দিষ্ট লাইনে এসটিপিতে যাবে। সেখানে বৃষ্টির পানি ঢোকার সুযোগ থাকবে না। আর এখন যেহেতু ঢাকার বড় একটি অংশের পয়ঃবর্জ্য হাতিরঝিলে পড়ছে, তাই হাতিরঝিল থেকে পানি টেনে দাশেরকান্দি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তা পরিশোধন করে আবার রামপুরা খালে পরিষ্কার পানি ফেলা হচ্ছে।

জানতে চাইলে ওয়াসার জনসংযোগ কর্মকর্তা আব্দুল কাদের সংস্থাটির একটি লিখিত বক্তব্যে জাগো নিউজকে বলেন, ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য হাতিরঝিলের উভয় পাশের বিদ্যমান ডাইভার্টেড স্যুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে দাশেরকান্দিতে এসটিপিতে নিয়ে পরিশোধন করা হচ্ছে। যা এর আগে সরাসরি রামপুরা খালে নিষ্কাশিত হতো। বর্তমানে পয়ঃবর্জ্য লাইন নির্মাণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। আশা করি দ্রুত শুরু হবে।’