পুলিশ কোনো দলের নয় চলবে আইন অনুযায়ী
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:০০ এএম, ১১ মে ২০২৬ সোমবার
পুলিশ প্রশাসন কোনো দলের নয়, বিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে ‘পুলিশ কল্যাণ প্যারেড’ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। সকাল ৯টায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে পুলিশ বার্ষিক প্যারেডের বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ পরিদর্শনের মধ্যদিয়ে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে ‘কল্যাণ প্যারেড’ সভায় যোগ দেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) স্টল পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বক্তব্য স্পষ্ট, পুলিশ প্রশাসন কোনো দলের নয়, বিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী পুলিশ প্রশাসন পরিচালিত হবে। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা অবশ্যই আপনাদের দায়িত্ব। আমরা থানাগুলোর পরিবেশ এমনভাবে করতে চাই, যা আইজি সাহেব উনার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যেন একজন মানুষ কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি থানায় গিয়ে নির্ভয়ে তার অভিযোগ জানাতে পারেন এবং একসঙ্গে প্রতিকারও পেতে পারেন।
তিনি বলেন, জনগণের সহযোগিতা ছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন। এই কারণেই পুলিশের জন্য জনগণের আস্থা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। কমিউনিটি পুলিশিং এবং ওপেন হাউজ ডে’র মতো জনমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে জনগণকে পুলিশি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। জনগণের সঙ্গে পুলিশের আস্থার সম্পর্ক তৈরি হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
দেশে যেন আর ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে- মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনে আপনারা সারা দেশে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আপনাদের গণতন্ত্রকামী জনগণের পক্ষ থেকে আমি অভিনন্দন জানাই। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, অবশ্যই পুলিশের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন সম্ভব। তবে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের জনগণ ভিন্ন চিত্রও দেখেছে। বাংলাদেশে যেন আর কখনোই ফ্যাসিবাদী শাসন ফিরে না আসে- আসুন, এই পুলিশ সপ্তাহে সেটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
তিনি আরও বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বজায় রাখা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের হীন দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। সেই অন্ধকারের সময় পেরিয়ে এখন সময় এসেছে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার।রাজনৈতিক সংবাদ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশের কাজ ‘দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন’। জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হবে আইনগত এবং মানবিক। জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হোক আস্থা এবং নির্ভরতার। যেকোনো বিপদে-আপদে জনগণ যেন থানা পুলিশকে তাদের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল মনে করতে পারে, আপনাদের কাছে আমার এতটুকুই চাওয়া। দেশে বর্তমানে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা অনেক বেশি। বর্তমান সরকার যে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার, আপনাদের কার্যক্রমে যেন সেটি প্রতিফলিত হয়- সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনাদের।
তিনি বলেন, আমরা বলে থাকি জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। জনগণ যদি মালিক হয় তাহলে এই মালিক যখন বিপদে পড়ে থানায় যায়, সেখানে তারা আপনাদের আচরণে যেন কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের মালিকানা অনুভব করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা আপনাদের দায়িত্বের অংশ বলে আমি মনে করি। আপনাদের মনে রাখা দরকার আইনি সহায়তা পেতে সাধারণ মানুষ প্রথমেই থানায় আসে। পুলিশের সহায়তা চান। বিপদে না পড়লে মানুষ থানায় যায় না। সুতরাং থানায় যাওয়ার পর তার বিপদ কমবে, মানুষের মনে এমন ধারণা তৈরি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আপনারা অবশ্যই যেকোনো বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন। তবে সেখানে যদি মানবিকতার ছোঁয়া থাকে, তাহলে আপনাদের কারণে সরকারের সাফল্যগুলো জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তারেক রহমান বলেন, কয়েকদিন আগে আমি জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে যে কথাটি বলেছিলাম, আমার মনে হয় সেটি আজকের এ অনুষ্ঠানেও আপনাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আপনারা হচ্ছেন, মাঠপর্যায়ে সরকারের অ্যাম্বাসেডর। আপনাদের দক্ষ এবং তাৎক্ষণিক কৌশলী সিদ্ধান্ত যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খুবই গুরুত্ব্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আপনারা কেবল আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্য নন; আপনারাই হচ্ছেন রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ন্যায়বিচার প্রদানের প্রথম দ্বার।
তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাইবার পুলিশ প্রতিষ্ঠা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডাটা বিশ্লেষণসহ বিকাশমান প্রযুক্তির সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবহার আরও সম্প্রসারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ লক্ষ্যেই সরকার একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধ, সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল ও ফরেনসিক সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাসহ এসব বিষয়গুলোকে আরও কার্যকর করতে সরকার পর্যায়ক্রমিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে চায়। গুম অপহরণ কিংবা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা করা প্রতিটি পুলিশের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলাদেশ পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা, পেশাদারিত্ব ও জনআস্থা আরও সুদৃঢ় করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বদলি, পদোন্নতি কিংবা পুলিশে নিয়োগ- এসব ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা এবং সততাকেই আমরা প্রাধান্য দিতে চাই।
পুলিশের দাবি-দাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পুলিশ বাহিনীকেও আরও দক্ষ এবং আধুনিক করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যে পুলিশ সদস্যদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের আবাসন সংকট সমাধান, মানসম্মত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা, রেশন এবং ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়গুলো সরকারের বিবেচনার ভেতরে রয়েছে।
পুলিশের ওভারটাইম ভাতার কথা ভাবছে সরকার: অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের জন্য বিশেষ নীতিমালার ভিত্তিতে ওভারটাইম ভাতা প্রদানের কথা ভাবছে সরকার। এটি তাদের মনোবল বৃদ্ধি ও সেবার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। এক্ষেত্রে পুলিশের ইন্সপেক্টর থেকে নিম্নে কনস্টেবল পদ পর্যন্ত ওভারটাইম ভাতা বিবেচনা করা হতে পারে। এ ছাড়া, পুলিশ বাহিনীকে একটি জনকল্যাণমুখী ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের আর্থিক সঙ্গতি ও সক্ষমতা বিবেচনায় তাদের যৌক্তিক দাবিসমূহ পূরণ করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অনেক পুলিশ কনস্টেবলরা ৪০ বছর চাকরি করে অবসর গ্রহণ করেও পরবর্তী পদোন্নতি পান না। সেজন্য বিশেষ নীতিমালা ও সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ড বিবেচনায় অবসরকালীন সময় কিছু সংখ্যক পুলিশ সদস্যকে কনস্টেবল থেকে অনারারি সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) পদে, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) থেকে অনারারি উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে এবং উপ-পরিদর্শক (এসআই) থেকে অনারারি পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদে পদোন্নতি দেয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অধিক কর্মচাপ বিবেচনায় পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালকে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিপূর্বক আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষান্তে আরও উন্নত হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ভবন/কার্যালয় নির্মাণ ও আবাসন সমস্যা দূরীকরণে বর্তমান সরকার আন্তরিক। এক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণসহ প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
