শনিবার   ০৯ মে ২০২৬   বৈশাখ ২৫ ১৪৩৩   ২২ জ্বিলকদ ১৪৪৭

পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া ঝড়ে বাংলাদেশের সতর্কতা

মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৫:৩৬ এএম, ৯ মে ২০২৬ শনিবার



ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সর্বশক্তি প্রয়োগ করে নিরঙ্কুশ বিজয় (২০৬ আসন) লাভ করার পর পাল্টে গেছে রাজনীতির হিসেব নিকেশ। তৃণমূলের সংগ্রহে ৮০টি। ‘বিজেপি বিজয়ের পথে’ রয়েছে এমন সংবাদ প্রচার হতেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ভাংচুর, তৃণমূল নেতাদের ধরে প্রকাশ্যে মুখে গেরুয়া রং মেখে জামাকাপড় ছিঁড়ে দেয়া, তৃণমূল নেতাদের ধরে গণপিটুনি, মুসলিমদের বাড়িতে হামলা করে লুটপাট করার মতো দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছে ৪ জন। বিজেপি নেতারা সহিংসতার পর পুলিশকে সরাসরি দাঙ্গা দমনে কঠোর হতে বলেছে। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব অপরাধ করেছে তৃণমূলের কর্মীরা! পরিস্থিতি শান্ত না হতেই বিজেপি নেতা শুভেন্দুর ব্যক্তিগত সহকারীকে বুধবার রাতে তার গাড়ী আটকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকান্ডকে ঘিরে রাজনীতির মাঠ নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। চাপে রয়েছেন স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি ও অভিষেক। এবার পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ‘জয়বাংলা’র পরিবর্তে ‘পদ্মফুল’কে সমর্থন দিয়েছে।
বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি সেক্যুলার রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন শাসন করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে সাধারণত অসাম্প্রদায়িক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু  সেই পশ্চিমবঙ্গে এবার সাম্প্রদায়িক দল বিজেপিকে ভোট দেওয়ায় বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে চারদিকে। যদিও মমতা কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। রাজ্যপাল মমতার সরকার ভেঙে দিয়ে নিজেই দুদিনের জন্য দায়িত্ব নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত ১০ বছর যাবত পশ্চিমবঙ্গকে দখলে নিতে মরিয়া ছিলেন। ধর্মান্ধ বিজেপি সরকার ‘বাংলাদেশি’ ট্যাগ দিয়ে সীমান্তে উত্তেজনা ছড়াতে পারে বলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তে মুসলমানদের পুশইন করতে পারে বিজেপি নেতারা। এই নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে সতর্কতা প্রহরায় রয়েছে সীমান্তরক্ষিরা।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ফলাফল অনুযায়ী, রাজ্যে এক বিরাট পট পরিবর্তন ঘটেছে। ৪ মে ২০২৬ তারিখে ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, রাজ্যের মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ২০৬টি আসন, তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ৮০টি আসন, কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬টি আসন জয়লাভ করেছেন। ২৪ পরগণায় ফলতা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বাতিল হওয়ায় সেখানে পুন:নির্বাচন প্রক্রিয়া চলছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করতে চলেছে। যা রাজ্যের রাজনীতিসহ সবকিছুতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। অনেকে মনে করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে এবারও মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল বিজয়ী হবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বাঙালী সংস্কৃতি মমতা ব্যানার্জির রাজনীতির সঙ্গে মানানসই। তিনি অসাম্প্রদায়িক হওয়ায় মুসলমানরা বরাবরই টিএমসি’র জোড়া ফুল মার্কায় ভোট দিয়েছেন। ভারতের অবশিষ্ট অংশ বিশেষ করে গুজরাটের সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ গ্রহণ করতে চায় না। কিন্তু সেই বাঙালিয়ানার পরাজয় ঘটেছে। 
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি দখলে নেবার জন্যে বিজেপি এবারই প্রথম নয়। গত নির্বাচনেও সর্বশক্তি দিয়ে নেমেছিলো। কারণ বিজেপি যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংস্থা আরএসএস-এর নিয়মে চলে; ওই সংস্থা গবেষণা করে বের করেছে যে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। 
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির বিপুল বিজয়ের পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কোনও পরিবর্তন হবে না। নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এটা ভারতের গণতন্ত্রের ব্যাপার। বাংলাদেশ যেমন দীর্ঘদিন পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। বাংলাদেশের প্রত্যাশা তাই ভারতসহ সকল প্রতিবেশি দেশে গণতন্ত্রের চর্চা বিকশিত হোক।
বিজেপি নির্বাচিত হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র বিজয় অশনি সংকেত। অপরদিকে, এনসিপি সভাপতি নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ভারতে মুসলমান ও দলিত সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন শুরু হয়ে গেছে। মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে তিস্তার পানিচুক্তিতে আপত্তি জানানোর কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোড়ন হয়েছিলো। এবার বিজেপি মুসলিম বিতাড়নের নামে পুশইন করার চেষ্টা করলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফের ভারত বিরোধিতা বাড়তে পারে।