মঙ্গলবার   ০৫ মে ২০২৬   বৈশাখ ২১ ১৪৩৩   ১৮ জ্বিলকদ ১৪৪৭

বিদ্যুতের দাম ইউনিটে দেড় টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৮:৩০ এএম, ৫ মে ২০২৬ মঙ্গলবার

এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে দাম বাড়ানোর একটি প্রস্তাব গতকাল সোমবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত এবং খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। 

বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাধারণ গ্রাহকদের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন হারে দাম সমন্বয় করা হবে। তবে লাইফ লাইন বা স্বল্প বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের এই চাপের বাইরে রাখা হয়েছে। 

রীতি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো কমিশনের কাছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ (পিডিবি) বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রস্তাব পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাব অনুসারেই তাদের আবেদনপত্র তৈরি করছে, যা চলতি সপ্তাহেই বিইআরসিতে পাঠানো হতে পারে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, নিয়ম অনুসারে প্রস্তাব পেলে তা আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হবে। 

পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিমও বলেছেন, তারা প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কাজ করছেন। কমিশন এরপর বিধি অনুযায়ী গণশুনানি করে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সব ঠিক থাকলে জুনের শুরুতেই নতুন দর কার্যকর হতে পারে। 

জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান এবং ভর্তুকির বাড়তি চাপ সামাল দিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটির পরামর্শেই মূলত বিদ্যুৎ বিভাগ এই প্রস্তাব দিয়েছে। 
প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসে ৪০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। আবার ৭৬ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য এই বৃদ্ধি প্রায় ৭০ পয়সা হতে পারে। তবে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী বা লাইফলাইন গ্রাহকদের আপাতত এই বাড়তি চাপের বাইরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ গ্রাহক সরাসরি এই মূল্যবৃদ্ধির আওতায় পড়তে পারেন। বাকি ৬৩ শতাংশ স্বল্প ব্যবহারকারীরা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকতে পারেন। তবে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের খরচ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য এবং সেবার দামে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধি ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে। এর ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে নতুন চাপ তৈরি হবে। 

ভর্তুকির চাপ ও ঘাটতি
বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা দামের তুলনায় প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি। এই ঘাটতির কারণে ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে আরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে এ খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

এ ছাড়া অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে মেঘনাঘাট, আরপিসিএল-নোরিনকোর কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ও রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো এই আর্থিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে। 

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য গড়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়। তখন প্রতি ইউনিটের গড় খুচরা মূল্য ছিল ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। একই সময় পাইকারি মূল্যহার ৫ দশমিক ০৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।