সংসদে জামায়াতকে টার্গেট করে বিএনপি সরব
মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:৫১ এএম, ২ মে ২০২৬ শনিবার
মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারদের নিষ্ঠুরতার জন্যে জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করে সরব এখন বিএনপি। জাতীয় সংসদে বিএনপি’র একাধিক এমপি প্রায় অভিন্ন সুরে একাত্তর সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতের ভূমিকার জন্যে তাদেরকে ধিক্কার জানান। বিএনপি এমপিদের বক্তব্য ছিলো আক্রমনাত্মক। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার সুযোগ নিয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে নির্বাচিত এমপি ফজলুর রহমান তার স্টাইলে বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল প্রায় একই সুরে বক্তব্য রাখেন। প্রায় একই ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। বিএনপি তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীকে মুক্তিযুদ্ধকালের ভূমিকার মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে হঠাৎ টার্গেট করলো কেন এই প্রশ্নে এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনকালে অনেকে মুক্তিযুদ্ধকে চব্বিশের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করেন। বিএনপি নেতারা এই তুলনাকে সঠিক নয় বলে মনে করেন। এ প্রসঙ্গে ফজলুর রহমানের বিখ্যাত মন্তব্য হলো, ‘হিমালয়ের সঙ্গে টিলার তুলনা করবেন না’।
গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ ও জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর বক্তব্য দিয়েছেন। তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, কোনও মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। তিনি আরও যোগ করেন যে, কোনও শহীদ পরিবারের সদস্য যদি জামায়াত করে, তবে সেটি একটি ডাবল অপরাধ। বিরোধী দলীয় নেতা নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান দাবি করায় তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে শ্রদ্ধা জানালেও তিনি এটিকে বিপ্লব বলতে নারাজ। বরং একে গণঅভ্যূত্থান হিসাবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সমুদ্রের মতো গভীর, যার সাথে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। এক মাসের আন্দোলনের সাথে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের তুলনা করাকে তিনি “হিমালয়ের সঙ্গে টিলার” বা “প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে কুয়ার” তুলনা করেন। তার মতে, এ ধরনের তুলনা করা হলে মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করা হয়। তিনি বলেন, জামায়াতে পূর্ব পুরুষরা বাংলাদেশ চায়নি এবং তারা কখনই রাজনৈতিক যুদ্ধে জয়ী হতে পারবে না। তিনি একটি রুপক ব্যবহার করে বলেন, যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকবে, ততদিন মুক্তিযোদ্ধা জিতবে, রাজাকার কোনওদিন জয়লাভ করতে পারবে না।
ফজলুর রহমানের এসব বক্তব্যের সময় জামায়াতের বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ ও হইচই শুরু করেন। ফলে সংসদ প্রায় ১০ মিনিটের জন্য অচল হয়ে পড়ে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ পরিস্থিতি শান্ত করতে এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য হন। তিনি সংসদ সদস্যদের সংযত হওয়ার আহ্বান জানান।
গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত একদিনে ঘটে না। আপনারা বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সমঝোতা হতে পারে। কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে কোনও সমঝোতা হবে না। একাত্তরে যারা বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিলো, আজ তারা নতুন সাজে সামনে এসেছে।
তিনি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ২০০৪ সালে সাফমা কনফারেন্সে পাকিস্তানে যাওয়ার সময় তৎকালীন জামায়াতের একজন এমপি তার সঙ্গে ছিলেন। ওই এমপি ও পাকিস্তানের এক এমপি মিলে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ছিলো।
জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সংশ্লিষ্ট আদর্শিক বিষয়গুলো নিয়ে বিএনপির অবস্থান অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হওয়ার পেছনে বেশ কিছু রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। বিএনপি নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের দল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর জোর দিচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তারা জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে। সংসদে এসব প্রসঙ্গে যে সংসদ সদস্যরা কথা বলছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাদের ব্যক্তিগত আবেগ এবং ত্যাগের জায়গা থেকে তারা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে কোনও ছাড় দেওয়া মানে নিজ অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। বিএনপি নেতারা মনে করেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতার জন্য বা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস এবং চেতনাকে ধারণ করা জরুরি। তারা সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে জনগণের কাছে এই বার্তা দিতে চাচ্ছেন যে, বিএনপি একটি উদার কিন্তু আপোষহীন মুক্তিযোদ্ধার দল।
