লোডশেডিং চার হাজার মেগাওয়াট ছাড়াল
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৭:৪১ এএম, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার
গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। জ্বালানি সংকটে চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। ফলে সরকারি তথ্যমতেই কয়েক দিন ধরে দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। যদিও বিতরণ কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ সূত্রমতে, বিদ্যুতের ঘাটতি সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় গতকাল বুধবার চলতি মৌসুমের সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে।
খোদ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) মতে, গতকাল বিকেলে বিদ্যুৎ ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। যদিও বেসরকারি সূত্রমতে, প্রকৃত লোডশেডিং গতকাল চার হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল তিন হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। এ সময় পিজিসিবির ওয়েবসাইটে ছয় বিতরণ কোম্পানি মিলে লোডশেডিং দেখানো হয়েছিল ২ হাজার ৪৯৫ মেগাওয়াট।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বলেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানির একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।
আদানির সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বিয়ারিং থেকে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে ওই ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। মেরামতকাজ শেষ হতে তিন-চার দিন সময় লাগতে পারে। মঙ্গলবার রাত ১২টায় আদানি থেকে পাওয়া গিয়েছিল ১ হাজার ৪৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। রাত ২টায় তা নেমে আসে ৭৬৪ মেগাওয়াটে। গতকাল বুধবার রাতে এ প্রতিবেদন লেখার সময় পিজিসিবির ওয়েবসাইটে সর্বশেষ বিকেল ৪টার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। সে সময় আদানি থেকে ৭৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসেছিল। আদানির সরবরাহ কমায় রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটে। কোথাও কোথাও লোডশেডিং ১৫-১৬ ঘণ্টায় পৌঁছে।
এদিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি সংকট দেখা দেয় বিশ্বজুড়ে। কয়লা, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের অভাবে দেশে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। পিডিবি সূত্র জানিয়েছে, গতকাল দিনে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ওঠে ১৫ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াটে। উৎপাদন ও চাহিদার ফারাকের কারণে এ সময় লোডশেডিং দিতে হয় প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। দুপুরের পর থেকে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং বাড়তে শুরু করে। রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় এটি আরও বাড়তে পারে। গতকাল রাতের জন্য পিজিসিবি বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ধরেছিল ১৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। মঙ্গলবার রাতে পিক আওয়ার রাত ৯টায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার ৫৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছে। এ সময় উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৬২৩ মেগাওয়াট। ঘাটতি ১ হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট।
পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৬টি। এর মধ্যে গ্যাস স্বল্পতায় ১৩টি, জ্বালানি তেল না থাকায় ৯টি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন তালিকার বাইরে আছে। বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ১৭টি সৌর, যা থেকে রাতে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। ডিজেলচালিত পাঁচটি কেন্দ্রও বন্ধ রাখা হয় খরচ বেশি হওয়ায়। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এখন ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটের কারণে সেখান থেকে পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। গরমের শুরুতে এখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও সব মিলিয়ে উৎপাদন করা যাচ্ছে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
দেশজুড়ে ভোগান্তি
চলিত মাসের শুরু থেকে লোডশেডিং বাড়লেও ঢাকায় তেমন বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল না। তবে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যায়। রাজধানীর বাইরের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। পাশের গাজীপুর থেকে শুরু করে কুষ্টিয়া, নাটোর, নোয়াখালী, রাজবাড়ী, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেক বা তারও কম থাকায় দিনরাত দফায় দফায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার কারখানায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানা মালিকরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদনে ধস নামবে এবং ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সংকট দেখা দিতে পারে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ১৬-১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র পাঁচ থেকে সাত মেগাওয়াট। ফলে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১২ ঘণ্টাই লোডশেডিং হচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও রোগীরা বেশি কষ্টে পড়ছেন।
নাটোরে দিনরাতে চার-পাঁচবার লোডশেডিং হচ্ছে। সন্ধ্যাকালীন চাহিদা ১৫৩ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে ৯৩ মেগাওয়াট। এতে শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই জেলার লালপুরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৬ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না।
নোয়াখালীতে ৯ লাখের বেশি গ্রাহকের বিপরীতে চাহিদার তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ৩০-৪০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকার পর দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকছে সংযোগ। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের হাতে পাখা দিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে। জেনারেটর বা বিকল্প ব্যবস্থার অভাবে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা বলছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ২,০৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড়
দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মার্চ মাসের বকেয়া বিল পরিশোধে ২ হাজার ৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ভর্তুকি ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১ থেকে গত মঙ্গলবার জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়, এই অর্থ স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক (আইপিপি) এবং ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরপিপি) বিল পরিশোধে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অনুকূলে ছাড় করা হবে। অর্থটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের বিদ্যুৎ ভর্তুকি খাত থেকে দেওয়া হবে।
তবে এই ভর্তুকি ছাড়ে একাধিক শর্ত আরোপ করেছে অর্থ বিভাগ। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত অনুমোদনবিহীন দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিপরীতে কোনো অর্থ এ খাত থেকে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি এসব কেন্দ্রের দ্রুত অনুমোদন গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
