বৃহস্পতিবার   ২৩ এপ্রিল ২০২৬   বৈশাখ ৯ ১৪৩৩   ০৬ জ্বিলকদ ১৪৪৭

জ্বালানি তেলের জন্য প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৭:৩৪ এএম, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ও সরবরাহ বৃদ্ধির ঘোষণার পরও ভোগান্তি কমেনি। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহে লাইনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় পাম্পগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইনের আকার ধীরে ধীরে কমছে। যদিও পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। রাজধানীর ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত তেল মিলছে না।

রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, যেসব পাম্পে জ্বালানি রয়েছে, সেগুলোতে এখনও উপচে পড়া ভিড়। কোথাও তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা, আবার কোথাও সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। অনেক ক্ষেত্রে সীমিত পরিমাণে তেল সরবরাহ করায় দীর্ঘ অপেক্ষার পরও প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না। তেজাগাঁওয়ে সিটি ফিলিং স্টেশন ঘিরে সন্ধ্যায়ও ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ভিড় দেখা গেছে। তবে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ভিড় খানিকটা কমেছে।

সাভারের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, যেসব পাম্পে জ্বালানি রয়েছে, সেগুলোতেই উপচে পড়া ভিড়। কোথাও তিন ঘণ্টা, কোথাও ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তেল মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমার মধ্যে তেল সরবরাহ করায় দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে গ্রাহকদের।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাভারে মোট ৫২টি পাম্পের মধ্যে মাত্র ১৫টিতে অকটেন মজুত রয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ পাম্পে অকটেন বা পেট্রোল নেই। যেসব পাম্পে মজুত রয়েছে, সেগুলোর কিছুতে আবার এক হাজার লিটারেরও কম তেল রয়েছে। অন্যদিকে প্রায় ৭০ শতাংশ পাম্পে ডিজেল থাকলেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। লালন সিএনজি অ্যান্ড রিফুয়েলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়ানো মোটরসাইকেলের চালক ইকবাল হোসেন বলেন, মূল্য বাড়ানোর পর সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রতিফলন স্পষ্ট নয়। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর অল্প পরিমাণ তেল পেয়ে চলাচল চালিয়ে নেওয়াই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসআই চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মোস্তাক আহমেদ জানান, আগে কয়েক দিন পরপরও অকটেন পাওয়া যেত না। এখন তুলনামূলক ঘন ঘন মিললেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। সব পাম্পে একযোগে সরবরাহ না থাকায় নির্দিষ্ট কিছু পাম্পে চাপ বাড়ছে এবং লাইনের ভোগান্তি কমছে না।

রাজধানীর বাইরে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বরিশালের আগৈলঝাড়ায় বোরো মৌসুমে কৃষককে ডিজেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। 

আগৈলঝাড়ার রাজিহার গ্রামের কৃষক ইসলাম সরদার বলেন, নির্ধারিত দামে সীমিত পরিমাণ তেল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে এক দিনের কাজও চালানো যাচ্ছে না। এতে ধান মাড়াই ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই উপজেলার বাগধা গ্রামের রহিম মিয়া বলেন, এক দিন তেল পাওয়া গেলেও পরদিন পাওয়া যায় না। ফলে কৃষিকাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে।

রাজবাড়ীর চন্দনী ইউনিয়নের কৃষক জয় কুমার বিশ্বাস বলেন, তেল নিতে গিয়ে দিনের বড় অংশ সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পরও নিশ্চিত হওয়া যায় না, তেল পাওয়া যাবে কিনা। সময়মতো সেচ দিতে না পারলে ফসল ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

পাচুরিয়া গ্রামের রহিম সরদার জানান, জমিতে পানি দেওয়ার জন্য নিয়মিত ডিজেল দরকার। কিন্তু তেলের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গিয়ে সময় ও অর্থ দুই-ই নষ্ট হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে তমা ফিলিং স্টেশনের সামনে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। চালক রবিউল ইসলাম বলেন, রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সকালে তেল পাওয়া যায়নি। এতে বিশ্রাম ছাড়াই আবার কাজে ফিরতে হচ্ছে।

জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ বাড়ানো হলেও তা সমন্বিতভাবে বিতরণ না হওয়ায় সংকটের প্রভাব রয়ে গেছে। সব পাম্পে একযোগে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে নির্দিষ্ট কিছু পাম্পে চাপ বাড়তেই থাকবে।

এদিকে অবৈধ মজুত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২১ এপ্রিল এক দিনে ৩০৩টি অভিযানে ৬৩ জনকে ৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ৯ হাজার ২৪৪ লিটার জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে।

৩ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ১১ হাজার ১৯৭টি অভিযানে ৪ হাজার ৫৩টি মামলা দায়ের এবং প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৯৩ লিটার জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে।

রংপুরে অবৈধভাবে ডিজেল মজুতের দায়ে হানিফ মিয়া ও শাহিন মিয়াকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেরপুরে বাবর ফিলিং স্টেশন থেকে পাচারের সময় শতাধিক লিটার ডিজেল জব্দ করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। নোয়াখালীর হাতিয়ায়ও অভিযানে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি জব্দ করা হয়েছে।

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, সরবরাহ বৃদ্ধির প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হলেও অনিয়মিত বিতরণ, অবৈধ মজুত এবং বাড়তি চাহিদার কারণে সংকট পুরোপুরি কাটছে না। দ্রুত সমন্বিত সরবরাহ ও কঠোর নজরদারি না হলে এই ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতির বাস্তব উন্নতি হয়নি। লাইন হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্তু চাপ কমেনি। তেল কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত সরবরাহ না করায় সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ডিজেলের চাহিদা বেড়েছে। সামনে সেচ মৌসুমে এই চাপ আরও বাড়বে। সব পাম্পে একযোগে সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ভোগান্তি কমবে না।