জ্বালানির চাপ জনজীবনে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৭:০৮ এএম, ২০ এপ্রিল ২০২৬ সোমবার
জ্বালানির দাম বাড়ায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে জনজীবনে। দাম বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি ও পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে। জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথমেই পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এরপর শিল্প উৎপাদন, কৃষি সেচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বাড়ে। পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়ে। মোটাদাগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এ ছাড়া মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তাদের আয় স্থির থাকলেও ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যেই জ্বালানি সংকট কৃষি, শিল্প, যানবাহনসহ বিদ্যুৎ খাতেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি হয়ে আসার তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে দেশে জ্বালানির সংকট দেখা দেয়। রোববার থেকে কার্যকর নতুন দরে ডিজেলের লিটার ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। একইসঙ্গে অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দামও লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি’র দামও বাড়ানো হয়েছে, যা কার্যকর হয়েছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খাতে ভাড়া বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে। সকালে দাম বাড়ার ঘোষণার পর বিকালের মধ্যেই দূরপাল্লার বাস ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, তেলের দাম বাড়লেও ভাড়া সমন্বয়ের কোনো নির্দেশনা না থাকায় মালিকরা লোকসানে পড়ছেন। তিনি কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ৫ পয়সা করার দাবি জানান।
ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রতিদিন সারা দেশ থেকে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক আসে। এসব পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যয় বাড়বে, যা খুচরা বাজারে দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিমধ্যে কাঁচাবাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। অধিকাংশ সবজির দাম কেজিপ্রতি ৮০ টাকার ওপরে উঠে গেছে, যা রোজার সময় ৬০ টাকার মধ্যে ছিল। ডিমের ডজনও মাস খানেকের ব্যবধানে ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১২৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
কলকারখানার জেনারেটর চালানো এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরিচালনার জন্য জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। তেলের দাম বাড়লে শিল্প পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা স্থানীয় বাজার ও রপ্তানি-উভয় ক্ষেত্রেই পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
কৃষি খাতেও এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। দেশে সেচকাজে ব্যাপকভাবে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ায় ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানা, শপিংমল ও হাসপাতালগুলোতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়, যা মূলত ডিজেলনির্ভর। জ্বালানির দাম বাড়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়বে এবং এর প্রভাব পণ্য ও সেবার খরচ বেশি পড়বে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা এতে বেশি চাপে পড়বেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিমানের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের দাম বাড়লে বিমানের টিকিট এবং ভ্রমণের সার্বিক খরচ বেড়ে যায়। এটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, রাইড শেয়ারিং খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। পাঠাও ও উবারসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে যুক্ত চালকদের পাশাপাশি অফলাইনে কাজ করা চালকরাও জ্বালানির জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাদের আয় কমে যাচ্ছে। অনেক চালক প্রতি রাইডে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৭০ টাকা ভাড়া দাবি করছেন।
এদিকে ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। সন্ধ্যার পর শপিংমল ও মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি কমে গেছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের পক্ষে এই অস্থিরতার ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ওদিকে নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়লেও মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কেবল জ্বালানির দামের ওপর নির্ভর করে না; বরং বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ৮.৭১ শতাংশে নেমেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.১৩ শতাংশ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেশি থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি চাপে রয়েছে। জ্বালানি তেল ও এলপিজি’র দাম বাড়ায় এই চাপ আরও বাড়বে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, ডিজেলের দাম আরেকটু কম বাড়ানোর দরকার ছিল। ৫-৭ টাকা বাড়ানো যেতো। এক ধাক্কায় ১৫ টাকা বাড়ানো অর্থনীতির ওপর অনেক বড় চাপ তৈরি করবে। কারণ ডিজেল ব্যবহৃত হয় সবচেয়ে বেশি। গরিবদের কাজে বেশি ব্যবহার হয় ডিজেল। যেমন কৃষি কাজ ও পিকআপ বা ট্রাকে ডিজেলের ব্যবহার হয়। তিনি মনে করেন, দেশের জনগণের ওপর জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে অনেক কষ্ট পেতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে, বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। কারণ এটি পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক বা গণপরিবহনে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে এর মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে দুর্ভোগ ডেকে আনবে। সরকারের এই গণবিরোধী সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, জ্বালানির সংকটে দেশের সব শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে অন্তত ৩০ শতাংশ। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক কারখানা। বিশেষ করে ডিজেলচালিত কারখানাগুলো একেবারেই বন্ধ রয়েছে। বিকেএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু কার্যত তা বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না।
