রোববার   ১৯ এপ্রিল ২০২৬   বৈশাখ ৫ ১৪৩৩   ০২ জ্বিলকদ ১৪৪৭

হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৭:৩১ এএম, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ রোববার

মার্কিন অবরোধকে কেন্দ্র করে আবারো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ওই প্রণালিতে অবরোধ অব্যাহত থাকবে- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এমন মন্তব্য করার পরপরই ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা এর মধ্য দিয়ে ‘দস্যুতা’ চালাচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ অব্যাহত রেখেছে। ফলে এই প্রণালি যুদ্ধবিরতির আগের অবস্থায় ফিরে গেছে বলে ঘোষণা দিয়েছে ইরান। যুদ্ধবিরতির আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া মানে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ। এমন ঘোষণার পর পরই শনিবার একটি ট্যাংকারে দু’টি গানবোট থেকে গুলি করেছে আইআরজেসি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ইরানের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে ভারতীয় দু’টি জাহাজে গুলি করেছে। ফলে তারা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজ ভারতীয় পতাকাবাহী ভিএলসিসি সুপারট্যাংকার। তারা ২০ লাখ ব্যারেল ইরাকি তেল বহন করছে। অডিও রেকডিংয়ে জাহাজটির ক্যাপ্টেন বলেছেন- প্রণালি পার হওয়ার ক্লিয়ারেন্স দেয়া হয়েছিল তাদেরকে। তবে ইরানের নৌবাহিনী তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছে ওই প্রণালি দিয়ে আর কোনো জাহাজকে অতিক্রম করতে দেয়া হবে না। ফলে গত কয়েকদিনে হরমুজ দিয়ে তেল সরবরাহের যতটুকু আশা করা হয়েছিল, তাও এখন অনিশ্চয়তায়।

মেরিন ট্রাফিকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘোষণা দেয়ার দু’ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে হরমুজে অবরোধ কার্যকর করেছে ইরান। ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছিল জাহাজগুলোকে।
এরই মধ্যে শান্তি সংলাপ নিয়ে কঠোরভাবে কাজ করে যাচ্ছে কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে অন্যতম পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও সৌদি আরব উল্লেখযোগ্য। তবে হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ এবং অবরোধ নিয়ে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে যুদ্ধ আবার যেকোনো মুহূর্তে শুরু হয়ে যেতে পারে। যদি সেটাই হয় তাহলে এবার ইরানের জন্য পরিণতি ভালো না-ও হতে পারে। কারণ, ইরানের চারপাশে কাতার, কুয়েত, জর্ডান, সৌদি আরব সহ যুক্তরাষ্ট্র তার সব ঘাঁটিতে সামরিক সজ্জা নিপুণভাবে সাজিয়েছে। এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, পারমাণবিক উত্তেজনা ও নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কায় আমেরিকা ইরানের আশপাশে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে সৈন্য ও যুদ্ধাস্ত্র সমাবেশ ঘটিয়েছে। যে করেই হোক ট্রাম্প চাইছেন তেহরানের হাতে থাকা প্রায় ৪৫০ কিলোগ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তার নিয়ন্ত্রণে নেয়ার।
কয়েকদিনের মধ্যেই একটি চুক্তি হবে বলে আশা করছেন মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আব্দেলাত্তি। তিনি বলেছেন, আমরা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য খুব জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।

২৮শে ফেব্রুয়ারির পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে নিবিড়ভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মিশর, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব। এই আলোচনার মধ্যেই আবারো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অবরোধ অব্যাহত রাখার প্রেক্ষিতে তারা এ ব্যবস্থা নিয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকবে। ইরানের গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক অপারেশনাল কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া এই অবরোধকে দস্যুতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তারা বলেছে, এ কারণে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এই কৌশলগত জলপথ এখন সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না ইরান থেকে গন্তব্যে যাওয়া এবং গন্তব্য থেকে ইরানে ফেরত আসা জাহাজগুলোর পূর্ণ নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃস্থাপন করছে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি কঠোর নিয়ন্ত্রণে এবং আগের অবস্থাতেই থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল হরমুজের কাছে একটি ট্যাংকার হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপসের দু’টি গানবোট থেকে এই হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স। ওমান থেকে উত্তর-পূর্বদিকে ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে এ ঘটনা ঘটে। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও এতে নতুন করে আবার হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধের আগে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। সেই পথের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এতে আরও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। শুক্রবার ইরান ও ডনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই ঘোষণা করে যে, প্রণালিটি আবার জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো, বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদে তুরস্কের আনতালিয়া কূটনৈতিক ফোরামের সাইডলাইনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন বুধবারের মধ্যে ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘আবার বোমা হামলা শুরু করবে’। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাতিবজাদে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘খুব বেশি কথা বলেন’। তিনি বলেন, একই বক্তব্যের মধ্যেই তিনি পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন। তিনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন, আমি নিশ্চিত নই। খাতিবজাদে আরও বলেন, ইরান বিশ্বাস করে ‘যুদ্ধ কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে না’। তবে আক্রমণের মুখে পড়লে দেশটি আত্মরক্ষা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। ‘শেষ ইরানি সৈনিক পর্যন্ত আমরা লড়বো।’

মার্কিন ‘লঙ্ঘনের’ জবাবে ‘উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া’

ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপসের নৌ কমান্ড আবারো জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি আগের সীমাবদ্ধ অবস্থায় ফিরে গেছে। এক্সে দেয়া তাদের পোস্টে বলা হয়, ইরান থেকে এবং ইরানে আসা জাহাজ চলাচল যতক্ষণ হুমকির মুখে থাকবে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালির অবস্থা আগের মতোই থাকবে। এতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের জবাবে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া দেয়া হবে।
ওদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, আনতালিয়া কূটনৈতিক ফোরামে অংশ নিয়ে মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘চূড়ান্ত একটি চুক্তি’ আনতে মিশর ও পাকিস্তান ‘খুব জোরালোভাবে’ কাজ করছে। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তা সম্ভব হবে। তিনি আরও যোগ করেন, আমরা শুধু এ অঞ্চলেই নয়, পুরো বিশ্বই এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকার কারণে ভুগছে।
এএফপি আরও জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতির সময় ইরান সাময়িকভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ খুলে দেয়ার পর শনিবার অন্তত আটটি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। মেরিটাইম ট্র্যাকিং ডাটা অনুযায়ী, একটি অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকার, চারটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসবাহী জাহাজ, দু’টি তেল ও রাসায়নিকবাহী ট্যাংকার এবং একটি তেলজাত পণ্য বহনকারী জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছে। মেরিন ট্রাফিক প্ল্যাটফর্মে আরও দেখা গেছে, ইরানের লারাক দ্বীপের কাছে আরও কয়েকটি অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকার অবস্থান করছে। যুদ্ধের সময় ইরানি বাহিনীর আরোপিত অবরোধের মধ্যে উপসাগর ত্যাগ করতে চাওয়া জাহাজগুলোর জন্য এটি একটি চেকপয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধ ‘ভুল হিসাব’ হতে পারে
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমাসরি আল-জাজিরাকে বলেন, আইআরজিসি’র বার্তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ বজায় রাখলে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে হুমকি হিসেবে ব্যবহার করতে থাকবে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল এবং গতিশীল। আমরা পুরোপুরি স্পষ্টতা পাচ্ছি না। তিনি আরও বলেন, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র যা বলেছে ও করেছে, তা বিবেচনায় নিলে এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। মনে হচ্ছে ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভুল হিসাব হতে পারে। তার মতে, ট্রাম্প যে আলোচনা নিয়ে ইতিবাচক কথা বলছেন, তা পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে, যদি যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে। স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালাইসিস অস্ট্রেলিয়ার পরিচালক মাইকেল শুবারিজ বলেন, হরমুজ প্রণালির পরিবর্তিত অবস্থা সম্ভাব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তিনি বলেন, প্রথম ট্যাংকারগুলোকে প্রণালি পার হতে দেখা বিশ্বজুড়ে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ না তোলায় ইরানের আবার প্রণালি বন্ধ করে দেয়া বড় ধাক্কা। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প হয়তো নিজেকে বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে বিষয়টিকে অতিরিক্তভাবে ব্যবহার করেছেন।

তুরস্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক
আনতালিয়া কূটনৈতিক ফোরামের সাইডলাইনে পাকিস্তান, মিশর, সৌদি আরব এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাদের তৃতীয় পরামর্শমূলক বৈঠক করেছেন। তারা আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তন নিয়ে মতবিনিময় করেন এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সংলাপ ও কূটনীতির ভূমিকার ওপর জোর দেন। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমন্বয় বাড়ানো ও সহযোগিতা জোরদার করার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান। তারা গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা আয়োজন করে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরও এই আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।