‘আজ বাসায় বাজার হবে না, বাজার হলে বাবা-মায়ের ঔষধের টাকা হবে না’
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৭:২৪ এএম, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ রোববার
‘আজকে হয়তো আমার বাসায় বাজার হবে না। বাজার করব কী দিয়ে, সারা দিন তো তেলের জন্য বসে আছি। বাজারের কথা চিন্তা করলে বাবা-মায়ের ঔষধের টাকা হবে না। আর ঔষধের টাকার চিন্তা যদি করতে যাই, তাহলে বাজার হবে না।’ কথাগুলো বলছিলেন মোটরসাইকেল চালক তরিকুল ইসলাম।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর পরিবাগের মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনে কথা হয় মোটরসাইকেলে রাইডশেয়ার করা এই চালকের সঙ্গে।
তরিকুল ইসলাম জানান, সকাল ৭টায় তেল নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। বেলা সাড়ে তিনটার সময়ও তেল পাননি। তাঁর সামনে তখনো শতাধিক মোটরসাইকেল তেলের জন্য অপেক্ষায়। তার নম্বর আসতে আরও ঘণ্টাখানেক সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন। তেলের সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে আগের মতো যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন না বলে জানান এই মোটরসাইকেলচালক।
এমন অবস্থা শুধু তরিকুলের নয়, তাঁর মতো রাইডশেয়ারে মোটরসাইকেল চালানো অন্য চালকদেরও একই অবস্থা। অনেকেই সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, কেউ কেউ এরই মধ্যে ঋণও করে চলছেন।
তরিকুল ইসলাম বলেন, তেল নিতেই এখন দিন পার হয়ে যায়। কখনো কখনো ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যায় না। যে সময় যাত্রী পরিবহন করে ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হতো, সেখানে এখন পুরো দিন রোদে বসে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। এসব পানি, খাওয়া বাবদ ৩০০ টাকার মতো অতিরিক্ত খরচ হয়।
৯ বছর ধরে ঢাকায় মোটরসাইকেলে রাইডশেয়ার করেন তরিকুল ইসলাম। বললেন, মা–বাবা, বোন ও এক ভাগ্নেসহ পরিবারে ছয় সদস্য। রাজধানীর মিরপুরের ভাড়া বাসায় থাকেন সবাই। সংসার খরচ তাকেই চালাতে হয়। আগে চলতে পারলেও এখন রীতিমতো হিমশিম খান। তেলের সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে বাড়িভাড়া পরিশোধ ও পরিবারের খরচ চালাতে ১৫ হাজার টাকার মতো ঋণ করেছেন।
এই মোটরসাইকেলচালক বলেন, ‘দোকানেও কিছু বাকি করেছি। আগে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা ইনকাম থাকলেও এখন সেটা অনেক কমে গেছে। তেল নিতে গিয়ে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন লস যায়।’
একই ধরনের কথা বললেন তিন বছর ধরে রাজধানী ঢাকায় মোটরসাইকেলে রাইডশেয়ার করা চালক মো. মাসুম। তিনি জানান, তেলের সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে আর আগের মতো ভাড়া নেই। একদিকে তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয়, অন্যদিকে রাজধানীর সব সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলার ফলে তাঁদের বেশির ভাগ ভাড়া এখন অটোরিকশা নিয়ে যায়। ফলে মোটরসাইকেল চালকেরা যাত্রীসংকটে রয়েছেন।
মো. মাসুম বলেন, ‘আগে যেখানে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বাইক চালিয়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা ভাড়া পেতাম, এখন ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চালিয়েও সেটি পাই না। আর আমাদের ভাড়া অর্ধেকে নিয়ে যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো। ৩০০ টাকার ভাড়া তারা ১৫০ টাকাতেই চলে যায়।’
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো কোনো ধরনের লাইসেন্স এবং সরকারকে ট্যাক্স দেওয়া ছাড়াই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ এই চালকের। তাঁর মতে, এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো যেসব স্থানে চার্জ দেওয়া হয়, সেগুলোও চুরি করা বিদ্যুতে। ফলে তাদের তেমন খরচ না থাকলেও তাদের আয় বেশি। এতে দিন দিন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে।
চাকরি ছেড়ে দিয়ে দুই বছর আগে কিস্তিতে মোটরসাইকেল কিনে রাইডশেয়ার করেন চালক বিল্লাল হোসেন। এদিন বিকেলে তিনি জানান, তেলের এই সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁর ভাড়া কমে গেছে। ফলে পরিবারের খরচ চালানো ও কিস্তি পরিশোধ করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই তিনি ঋণ করে মোটরসাইকেলের কিস্তি পরিশোধ করছেন।
অনেক টানাটানির মধ্য দিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে উল্লেখ করে বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘বসে বসেই দিন পার। ভাড়া মারব আর কখন? কী করব, কিছু তো করার নেই। গতকাল ৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাইনি। আজকে আবার সকাল ৮টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন বিকেল ৪টা বাজে। এভাবেই দিন যাচ্ছে।’
প্রতিদিনই রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা যাচ্ছে, তেলের জন্য চালকদের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। আজ বেলা ১১টার সময় মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, ফিলিং স্টেশনটিতে ৪০৯টি মোটরসাইকেল আর ২৭৯টি প্রাইভেট কার তেলের জন্য অপেক্ষা করছিল।
বিকেল ৪টার সময় পরিবাগের মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশন তেলের জন্য লাইন দাঁড়ানো ছিল ৭৭০টি মোটরসাইকেল আর ২৯৩টি প্রাইভেট কার। সূত্র: প্রথম আলো
