শুক্রবার   ১০ এপ্রিল ২০২৬   চৈত্র ২৭ ১৪৩২   ২২ শাওয়াল ১৪৪৭

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ সবার চোখ ইসলামাবাদে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৪:৪৬ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০২৬ শুক্রবার


যুদ্ধ সাময়িক স্থগিত হলেও শংকা ও উদ্বেগ সারা বিশ্বে। ট্রাম্পের কোন কথা কিংবা প্রতিশ্রুতি কেউ বিশ্বাস করেন না। কার পরামর্শে ট্রাম্প ছুটছেন বিশ্ববাসীর তা অজানা নয়। তার দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোথায় তার হাত পা বাধা। 
ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন ইরানের "পুরো সভ্যতা" মুছে দেবেন - পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস একরাতে শেষ করে দেবেন। কিন্তু সেই রাত শেষ হওয়ার পরে তেহরানের রাস্তায় যে পতাকা উড়ল, সেটা সাদা নয় - আত্মসমর্পণের নয়। তেহরানের ইসলামি বিপ্লব স্কোয়ারে হাজার হাজার মানুষ ইরানের সবুজ-সাদা-লাল পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে এলেন, জ্বালিয়ে দিলেন আমেরিকা ও ইসরায়েলের পতাকা, স্লোগান দিলেন আমেরিকাবিরোধী। চল্লিশ দিনের বোমাবর্ষণের পর, হাজারো মানুষের মৃত্যুর পর, তেহরানের রাস্তায় সেই রাতে যা দেখা গেল তা ছিল এক অদ্ভুত, জটিল, এবং গভীরভাবে অর্থবহ দৃশ্য।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানে অন্তত ২,০৭৬ জন নিহত হয়েছেন এবং সারা অঞ্চলে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। মার্কিন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ২৪৪ জন শিশু এবং ১,৬১৬ জন সাধারণ নাগরিক। এই রক্তের দামে কেনা যুদ্ধবিরতিকে ইরান সরকার "বিজয়" বলছে। কিন্তু রাস্তায় যারা পতাকা নাড়ছেন, তাদের সবার মনে কি একই অনুভূতি?
তেহরানের ক্যাফেতে জড়ো হওয়া তরুণ-তরুণীরা, পার্কে বসা পরিবারগুলো - সবাই একটাই প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করছিলেন: এই যুদ্ধবিরতি টিকবে তো? ভবিষ্যৎ কী হবে? তেহরানের ৩৩ বছর বয়সী সাংবাদিক সোহরেহ বললেন, যুদ্ধবিরতির খবর শুনে তার মনে তাৎক্ষণিক "স্বস্তি" এসেছে। তিনি বললেন, "আমার হৃদয় থামার উপক্রম হয়েছিল। সারাদিন ইরানের জন্য কাঁদলাম এবং যে ঈশ্বরে আমি বিশ্বাস করি না তার কাছে প্রার্থনা করলাম - একটি অলৌকিক ঘটনার জন্য।"
কিন্তু সবার অনুভূতি উদযাপনের নয়। তুরস্কে পালিয়ে যাওয়া এক তেহরানি নারী - নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ফেরার পর শাস্তির ভয়ে - ট্রাম্পকে সরাসরি বলেছেন: "তুমি এসে আমাদের অনেক মানুষকে হত্যা করেছ, আমাদের অবকাঠামো ধ্বংস করেছ।" তিনি আরও বললেন, এই যুদ্ধ ইরানে কার্যত একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিয়েছে। কিছু সরকারসমর্থকও হতবাক হয়ে গেছেন - কারণ সরকার বারবার বলে এসেছিল তারা কখনও সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে না, যতদিন "উপরের হাত" থাকবে ততদিন ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে থাকবে।
সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের বক্তব্য - যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম কৌশল ছিল ইরানের নেতৃত্বকে হত্যা করে সরকার ভেঙে দেওয়া। সেটা ব্যর্থ হয়েছে। চল্লিশ দিনের যুদ্ধে ইরান প্রমাণ করেছে, সে অনির্দিষ্টকাল সামরিক অভিযান চালিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। ইরানের জাতিসংঘে জেনেভা দূত আলি বাহরেইনি সতর্কতার সাথে বললেন, অনেক ইরানি আশঙ্কা করছেন এই যুদ্ধবিরতি পাঁচ সপ্তাহের কঠিন যুদ্ধে মাত্র একটি বিরতি মাত্র। অন্যরা উদ্বিগ্ন, আমেরিকা ইরানের ইসলামি সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
সব নজর ১০ এপ্রিলের ইসলামাবাদে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, বিশেষ দূত উইটকফ এবং জেরেড কুশনার মধ্যস্থতাকারীদের সাথে কথা বলছেন। কিন্তু তেহরানের রাস্তায় রাতভর পতাকা হাতে মিছিল করা মানুষগুলো একটা কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন - যে দেশকে "মুছে দেওয়ার" হুমকি দেওয়া হয়েছিল, সেই দেশ টিকে আছে, এবং তার মানুষ মনে করছেন তারা জিতেছেন। এই অনুভূতিটা ইসলামাবাদের আলোচনার টেবিলে আমেরিকার জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
যুদ্ধবিরতি হয়েছে। কিন্তু যেভাবে তেহরান উদযাপন করছে এবং ওয়াশিংটন বিজয় দাবি করছে - দুটো আখ্যান একসাথে সত্য হতে পারে না। ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে সেই সত্যটা একটু একটু করে বেরিয়ে আসতে শুরু করবে।