সোমবার   ০৬ এপ্রিল ২০২৬   চৈত্র ২২ ১৪৩২   ১৮ শাওয়াল ১৪৪৭

সংসদে আরমানের প্রশ্ন

গুম অধ্যাদেশ বাতিল কেন

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:০২ এএম, ৬ এপ্রিল ২০২৬ সোমবার

জামায়াতে ইসলামীর এমপি ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান সংসদ অধিবেশনে বলেছেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং মানবাধিকার অধ্যাদেশ কেনো বাতিল করেছে? এ প্রশ্ন তোলার সময় কান্না করেন ব্যারিস্টার আরমান। তার বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার অধ্যাদেশ দুটি বাতিল করবে না। সংশোধন করে পরবর্তীতে সংসদে উত্থাপন করা হবে। গুমে জড়িত প্রত্যেকে সাজা পাবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশের ৯৮টি হুবুহু এবং ১৫টি সংশোধন করে উত্থাপন করা হবে। ১৬টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হবে না। তবে সরকারি দলের ভাষ্য, অধ্যাদেশগুলো যাচাইবাছাই করে পরবর্তীতে বিল আকারে উত্থান করা হবে। চারটি অধ্যাদেশ রহিতের সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি।

উত্থাপন না করা ১৬টি বিলের মধ্যে রয়েছে, গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইন করে অধ্যাদেশ জারি করে। এতে কমিশনকে সরকারি বাহিনী ও সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনকে ক্ষমতা দেওয়া হয়। গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতাও দেওয়া হয় কমিশনকে।

এদিকে অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন না করায় আগামী ১১ এপ্রিল কার্যকারিতা হারাবে। ফিরে আসবে ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইন। এই আইনে সরকারি বাহিনী ও সংস্থার সদস্যদের তদন্তের ক্ষমতা নেই কমিশনের। গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশও কার্যকারিতা হারাবে ১১ এপ্রিল।

সংসদে ঢাকা-১৪ আসনের এমপি মীর আরমান বলেন, ‘আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি একটি অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে এসে। যেখানে আমার মত আরও শত শত লোককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্ত তাদের ফিরে আসার সৌভাগ্য হয়নি। তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমরা সেই অন্ধকার ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম। ধরে নিয়েছিলাম- এ অন্ধকার ঘরে আমাদের মৃত্যু হচ্ছে। হয়ত আমাদের হত্যা করবে, এখানেই আমাদের মৃত্যু হবে। কথা বলার কেউ ছিল না। কীটপ্রতঙ্গ-পিঁপড়া-টিকটিকির সঙ্গে কথা বলতাম। বুঝতে পারতাম না বাইরে দিন, নাকি রাত। মনে হতো- জীবন্ত কবর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মনে করতাম, মৃত্যুও হাজারগুণ ভালো।’

নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে মীর আরমান বলেন, ‘এইভাবে মৃত্যুর প্রহর যখন গুনছিলাম, এক রাতে টেনে-হিঁচড়ে বের করা হলো। তখন ধরে নিয়েছিলাম- আজকেই আমার মৃত্যু হবে। তখন আমি সূরা ইয়াসিন পড়া শুরু করেছিলাম যাতে মৃত্যুটা সহজ হয়। কিন্তু শুনলাম, কিছু বাচ্চা ছেলে জীবন দিয়ে, চোখ-পা হারিয়ে ফ্যাসিবাদকে বিতাড়িত করে আমাদের আবার দুনিয়ার আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।’

ব্যারিস্টার আরমান বলেন, ‘এ সংসদকে বলতে হয় মজলুমদের মিলন মেলা। এমন একজনকেও পাবেন না, যারা গত ফ্যাসিস্ট আমলে জুলুমের শিকার হয়নি। গুমের ভুক্তভোগী পরিবারদের পক্ষ থেকে বলছি, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলে স্তম্ভিত হয়েছি। আমাদের সঙ্গে যে জুলুম করা হয়েছিল তা যেন বাংলাদেশের মাটিতে না হয়, সে জন্য গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। বিশেষ কমিটি আইনগুলো বাতিলের সুপারিশ করেছে!’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মীর আরমান বলেন, ‘যে প্রধানমন্ত্রী নিজে নির্যাতনের শিকার, তারা কেমন করে এ অধ্যাদেশ বাতিলের পরামর্শ দেয়? অধ্যাদেশ যদি সংশোধন করতে চায়, তাহলে আগে অনুমোদন দিয়ে আইনে পরিণত করুক। পরে সংশোধিত করা হোক। যদি সেটা না করা হয়, ১২ তারিখ অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে গেলে, ১৩ তারিখ থেকে গুমের সংজ্ঞা থাকবে না।’

পয়েন্ট অব অর্ডারে আইনমন্ত্রী বলেন, যারা গুম হয়েছেন, তারা আমাদের স্বজন। তাদের অনেকে জিয়া পরিবারের সদস্য। বিরোধী দল হয়ত ভালো করে দেখেননি, মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ যেভাবে করা হয়েছে, তা আইনে পরিণত করা হলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনেও গুমের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বিচার ও তদন্ত হবে। আবার গুম আইনে ভিন্ন একটি তদন্তের কথা বলেছি। ট্রাইব্যুনালে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু গুমের আইনে ১০ বছর পর্যন্ত সাজা রাখা হয়েছে।

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়ে তিনি বলেন, অধ্যাদেশটি রাখা হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিরা হয়রানির শিকার হবেন, তদন্তের সময়সীমার কারণে। তাই আইন দুটি আরও বেশি যুগোপযোগী, জনকল্যাণমুখী করা হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিতে চলতি অধিবেশেনের মাঝামাঝি বা পরবর্তীতে অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সুনির্দিষ্টভাবে বিল আনব। যাতে করে অপরাধীরা কোনভাবে ছাড়া না পায়। কারণ ব্যারিস্টার আরমান আমার ভাই, স্বজন, সহকর্মী। উনি দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে গুমের শিকার হয়েছিলেন, সেইভাবে বাংলাদেশের সাত শতাধিক বেশি মানুষ গুমের শিকার হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখানে আছেন। তিনি যেভাবে গুমের শিকার হয়েছিলেন, মৃত্যুর প্রহর গুনেছিলেন প্রতিদিন। এটা মনে করার কারণ নেই, গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বের হতে পারবেন।