ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন পাস ইসরায়েলি পার্লামেন্টে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০২:০৮ এএম, ১ এপ্রিল ২০২৬ বুধবার
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে প্রাণঘাতী হামলার দায়ে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান সংবলিত একটি আইন পাস হয়েছে। এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দার ঝড় তুলেছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘ দিন ধরে ইসরায়েলের শাসনব্যবস্থাকে যেভাবে 'অ্যাপার্থাইড' (বর্ণবৈষম্যমূলক) হিসেবে বর্ণনা করে আসছে, এই আইন তাকে আরও পাকাপোক্ত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খবর আলজাজিরার।
এই আইনটি ইসরায়েলের ইহুদি নাগরিকদের ওপর প্রযোজ্য হবে না, যা দেশটির কট্টর ডানপন্থীদের মধ্যে উল্লাস সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং যুক্তরাজ্য এই বিলের 'প্রকাশ্য বর্ণবাদী' চরিত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, কারণ এর ভাষা ও প্রকৃতি শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করেই তৈরি।
রোববার এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লিখেছে, ‘আমরা এই বিলের বৈষম্যমূলক চরিত্রে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। এটি গ্রহণ করা হলে গণতান্ত্রিক নীতিমালার প্রতি ইসরায়েলের প্রতিশ্রুতি ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এই আইনকে ইসরায়েলি বর্ণবাদী ব্যবস্থার একটি ‘বৈষম্যমূলক হাতিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
আইনটি যেভাবে বৈষম্য তৈরি করছে
এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো সামরিক আদালত, যেখানে শুধুমাত্র দখলকৃত অঞ্চলের ফিলিস্তিনিদের বিচার করা হয়। নতুন আইন অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে কোনো ইসরায়েলি নাগরিককে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।
পরিসংখ্যান ও বৈষম্যের চিত্র :
দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার : ২০১০ সালে ইসরায়েলি আদালত ব্যবস্থা স্বীকার করেছিল যে, পশ্চিম তীরে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের ৯৯.৭৪ শতাংশকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
বসতিস্থাপনকারীদের ছাড় : গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক সপ্তাহে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা সাতজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। কিন্তু তাদের বিচার হয় ইসরায়েলের বেসামরিক আদালতে। 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর প্রতিবেদন মতে, এই দশকের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ইসরায়েলি নাগরিককে ফিলিস্তিনি হত্যার জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি।
বিচারের দুই স্তর ব্যবস্থা : নতুন আইনে বেসামরিক আদালত ইসরায়েলিদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, সামরিক আদালতে ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড হবে স্বয়ংক্রিয় বা বাধ্যতামূলক।
তদন্তের ফলাফল : ইসরায়েলি মানবাধিকার গোষ্ঠী 'ইয়েশ দিন' এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধ করা ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৯৩.৮ শতাংশ তদন্ত কোনো অভিযোগ গঠন ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
অনেকের মতে, এই আইনটি আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো আমিচাই কোহেন বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইসরায়েলি পার্লামেন্ট পশ্চিম তীরের জন্য আইন তৈরি করতে পারে না, কারণ ওই অঞ্চলটি ইসরায়েলের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ নয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এক বছরের মধ্যে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম থেকে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব অবসানের আহ্বান জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এই দখলদারত্বকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
ফিলিস্তিনিদের ওপর আইনি দমন-পীড়ন
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তার আইনি ব্যবস্থাকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়।
প্রশাসনিক আটক : ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ইসরায়েলি কারাগারে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই 'প্রশাসনিকভাবে আটক' হিসেবে বা 'অবৈধ যোদ্ধা' হিসেবে বন্দী আছেন।
শিশুদের অধিকার : হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি শিশুদের মা-বাবার উপস্থিতি ছাড়াই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং প্রায়ই তাদের আইনি সহায়তা নিতে বাধা দেওয়া হয়।
ঘরবাড়ি ধ্বংস : ফিলিস্তিনিদের জন্য ঘর তৈরির অনুমতি পাওয়া প্রায় অসম্ভব এবং অনুমতিহীন ঘরগুলো নিয়মিত ধ্বংস করা হয়। বিপরীতে, ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের অবৈধ স্থাপনাগুলোকে প্রায়ই বৈধতা দেওয়া হয়।
বিলে সমর্থনের পর ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরকে শ্যাম্পেন পান করে উদযাপন করতে দেখা গেছে। সমালোচকদের মতে, এই আইনটি ফিলিস্তিনিদের আরও দ্রুত এবং কম যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে হত্যা করার একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার মাত্র।
