হামসহ ছয় টিকার সংকট
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:৫৮ এএম, ১ এপ্রিল ২০২৬ বুধবার
দেশে প্রতি বছর জন্ম নেয় ৪০ লাখের বেশি শিশু। তাদের সুরক্ষায় ১২টি রোগ প্রতিরোধে দেওয়া হয় নয় ধরনের টিকা। জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত এসব টিকা পায় শিশুরা। তবে ফুরিয়েছে ছয় ধরনের টিকার মজুত। এগুলো হলো হাম-রুবেলা, পোলিও, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া-ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি। তবে এসব টিকা মাঠপর্যায়ে থাকার দাবি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপারেশনার প্ল্যান (ওপি) বাতিল হলে সংকটে পড়ে টিকা কার্যক্রম। দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিকা বঞ্চিত হয় অনেক শিশু। কমে যায় টিকাদানের হার। পরে সব ধরনের টিকার জন্য হাজার কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে শুধু শিশুদের টিকায় বরাদ্দ রাখা হয় ৮৪২ কোটি টাকা। সরাসরি কেনার পাশাপাশি টেন্ডারেও টিকা কেনার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই প্রক্রিয়া শেষ করা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কেটে যায় দীর্ঘ সময়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘আগে টিকাগুলো সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে কেনা হতো। এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অর্ধেক ইউনিসেফের কাছ থেকে এবং অর্ধেক ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে কেনা হবে বলে জানানো হয়। এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং পরবর্তীতে তা বাতিল হয়ে গেছে, এর কোনো বিকল্প হাতে রাখা হয়নি। এর ফল আমরা এখন ভোগ করছি। এখন পরিকল্পনা চলছে আবারও সরাসরি টিকা কেনা যায় কি না। এমনটি হলে বরাদ্দের বাকি অর্ধেক টাকা আমরা সরাসরি ক্রয়ে ব্যয় করতে পারব। এতে দেশে টিকার মজুত থাকবে। যেখানে সংকট আছে সেখানে পাঠানো সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে রাজধানীসহ সারা দেশের হাসপাতালে বাড়ছে হামে আক্রান্ত রোগীর ভিড়। কোথাও কোথাও হামে আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে অন্যান্য রোগীদের রাখায় এর সংক্রমণ বাড়ছে। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আট দিন আগে নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয় সাত মাস বয়সি ফাতেমা। ফাতেমার নানি জানান, গত ফেব্রুয়ারি থেকেই নিউমোনিয়াতে ভুগছে ফাতেমা। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্বিতীয় দফায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা নিতে এসে হামে আক্রান্ত হয়েছে ফাতেমা। এখন তার অবস্থা বেশ জটিল।
এ অবস্থায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার রোধে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে আলাদা রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সারা দেশের হাসপাতালে শুরুর দিকে হামের রোগীর সঙ্গে ঠান্ডাজনিত বা অন্য রোগের রোগীদের একসঙ্গে রাখায় ছড়িয়েছে সংক্রমণ। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধে হামের লক্ষণযুক্ত শিশুদের দ্রুত আইসোলেশনে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে সংক্রমণ অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। এজন্য দেশের সব সরকারি হাসপাতালে হামের চিকিৎসার জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করার নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিনা জাহান বলেন, গতকাল এই হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহীতে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে চলতি বছর এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
কুমিল্লা : কুমিল্লায় বাড়ছে হামের প্রকোপ। গতকাল সন্ধ্যায় কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির বলেন, গত এক মাসে ৬৯ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জনের পজিটিভ এসেছে। পর্যায়ক্রমে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এ বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি।
রাজশাহী : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ১৬ শিশু। গতকাল পর্যন্ত এ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে ৯৮ শিশু।
নাটোর : জেলাজুড়ে সোমবার পর্যন্ত ৩৮ জন আক্রান্ত হয়েছে। যার মধ্যে শুধু নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে ১৩ জন ভর্তি হয়েছে। গতকাল জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে জনসচেতনতা সভায় এ তথ্য জানানো হয়।
রংপুর : বিভাগের ৬ জেলায় ১০ শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। এর মধ্যে ছয়জন হাম এবং চারজন হাম রুবেলায় আক্রান্ত। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে মোট আট রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ৫৫ শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে। এ ছাড়া হাম সন্দেহে আরও ৯১ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে গতকাল এ তথ্য জানা যায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী জানান, শিশু ওয়ার্ডে ৭০ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে সাতজন সন্দেহভাজন হামের রোগী রয়েছে।
রূপগঞ্জ : প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে চার শিশু রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
পটুয়াখালী : জেলায় ৩০ মার্চ পর্যন্ত জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি আছে ১৬ শিশু। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় আট রোগী ভর্তি হয়েছে বলে জেলা সিভিল সার্জন অফিস রিপোর্টে জানা গেছে।
গোপালগঞ্জ : জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট সাত শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। জেলা সিভিল সার্জন আবু সাঈদ মোহাম্মদ ফারুক এ তথ্য জানান।
রাজবাড়ী : রাজবাড়ীতে পাঁচ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে বর্তমানে তিনজন রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ভর্তি। গতকাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ এ তথ্য জানান।
বাঞ্ছারামপুর : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় গত ৪৮ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে দুই শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। হাসপাতালের মুখপাত্র ও প্রধান আবাসিক চিকিৎসক ডা. রঞ্জন বর্মণ এ তথ্য জানান।
মুন্সিগঞ্জ : মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে তিনজন হামের রোগী ভর্তি আছে বলে নিশ্চিত করেছে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কর্তৃপক্ষ।
গাজীপুর : গত তিন মাসে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৪ রোগী চিকিৎসা নিয়েছে বলে সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানিয়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ : জেলা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সেখানে হামে আক্রান্ত হয়ে ৭৭ শিশু ভর্তি আছে। এ ছাড়া ১৩ শিশু চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে।
