মঙ্গলবার   ৩১ মার্চ ২০২৬   চৈত্র ১৬ ১৪৩২   ১২ শাওয়াল ১৪৪৭

লিবিয়ার দালাল কে এই আজিজ

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:৫৬ এএম, ৩১ মার্চ ২০২৬ মঙ্গলবার

এত মৃত্যু। লাশেরও হদিস নেই। সান্ত্বনার ভাষা নেই কারও কাছে। ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১০ যুবকের নির্মম এ পরিণতি হয়েছে। এত মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? একটি নামই উচ্চারিত হচ্ছে। আজিজ। কেউ বলেন আজিজ আহমদ আবার কেউ আব্দুল আজিজ। তবে লিবিয়ার এই দালাল ‘আজিজ’ নামেই বহুল পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সয়লাব আজিজের ছবিতে। শাস্তির দাবি উঠেছে তার। বলা হচ্ছে; তার মাধ্যমেই লিবিয়া গিয়ে ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি হয়েছে সুনামগঞ্জের ১০ যুবকের। প্রশাসন সক্রিয়। দালাল খুঁজে বেড়াচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও সরব। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা দালালদের খুঁজে বের করতে হবে। সুনামগঞ্জ ও জগন্নাথপুরের প্রশাসন নেমেছে মানব পাচারকারী দালালদের তালিকা তৈরি করতে। সবার মুখে আজিজের নাম। কে এই আজিজ- এ নিয়ে চলছে আলোচনা।

আজিজ আহমদ। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। সুনামগঞ্জের রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ইছগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। তার সম্পর্কে খবর নিতে গেলে স্থানীয় রানীগঞ্জের ৮নং ইউপি’র সদস্য নুরুল হক মেম্বার জানানÑ আজিজকে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে চিনেন না। তার ওয়ার্ডেই বাড়ি। প্রায় ১০-১২ বছর পূর্বে যুবক বয়সে সে পাড়ি জমায় লিবিয়া। ওখানেই সে বসবাস করে। বাড়িতে আসে না। তার নিজের বাড়িঘরের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রশাসনের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি গ্রামে তার বাড়িতে খোঁজ নিয়েছিলেন। জানান- আজিজ খুব বেশি শিক্ষিত নয়। যুবক বয়স পর্যন্ত বাড়িতেই থেকেছে। সে গরু, হাঁসের রাখালি করতো। পরিবারও খুব বেশি সচ্ছল ছিল না। নিম্নআয়ের মানুষ হিসেবেই তার পরিবার ছিল। প্রায় এক যুগ আগে আজিজ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। কোথায় গেছে প্রথমদিকে কেউ জানতো না। পরে অবশ্য এলাকার মানুষের কাছে জানাজানি হয় সে লিবিয়ায় গেছে। দালাল হিসেবে যে কাজ করে সেটি অনেকেরই কাছে অজানা ছিল। আজিজের প্রতিবেশীরা জানিয়েছেনÑ বাড়িতে আজিজের ভাই, চাচারা রয়েছেন। বিদেশ যাওয়ার পর থেকে আজিজের সঙ্গে কারও কোনো যোগাযোগ নেই। ৪-৫ বছর আগের ঘটনা। হঠাৎ একদিন তার বউ বাচ্চাকে বাড়ি থেকে অন্য কোথাও নিয়ে যায়। তারা জেনেছেন আজিজ তার পরিবারকে সিলেট শহরে নিয়ে আসে। পরে কেউ কেউ অবশ্য জানান- তার স্ত্রী-সন্তানদেরও লিবিয়া নিয়ে গেছে। এখন বাড়িতে আজিজের ভিটে থাকলেও কোনো ঘর নেই। বাড়িতে থাকা স্বজনদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ নেই। স্বজনরা তার সম্পর্কে বেশি কিছু জানেন না।সংবাদ বিশ্লেষণ সেবা

তারা জানান- জগন্নাথপুর ও পার্শ¦বর্তী দিরাই থানায় আজিজের মানব পাচার নেটওয়ার্ক। এতে কয়েকজন কাজ করে। তাদের মাধ্যমে আজিজ গেমের মাধ্যমে ইউরোপ পাঠানোর নামে লোক খুঁজে। টাকা নিয়ে ওদের পাঠায়। এবার যারা ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা গেছেন তাদের রমজানের আগে দেশ থেকে সৌদি আরব, মিশর হয়ে লিবিয়া নেয়া হয়। মেম্বার নুরুল হক জানিয়েছেন- আজিজসহ যারা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত তারা গোপনেই কাজ করে। কারণ হলো এক বছরে তার গ্রামসহ আশপাশ গ্রামের ১০-১২ জন যুবক সাগরপথে গ্রিসে গেছে। এর আগে এলাকার দালালদের সম্পর্কে তার তেমন কোনো ধারণা ছিল না। এদিকে- সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর ও দিরাইয়ের ১০ যুবক সাগরে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে প্রশাসন। এরইমধ্যে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিহত তরুণদের পরিবারকে সহযোগিতা করছে পুলিশ।

গতকাল বিকাল পর্যন্ত মামলা হয়নি। তবে কয়েকটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন জগন্নাথপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন-খবর পেয়ে পুলিশ মানব পাচারকারীদের তালিকা প্রস্তুত করতে কাজ শুরু করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৫ জনের নাম পাওয়া গেছে। তবে যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই প্রবাসে থেকে মানব পাচার করছে। এদিকে- লিবিয়ার মানব পাচার নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে প্রায় সময়ই কাজ করা হয়। তদন্ত সংস্থা সিআইডি একাধিকবার মানব পাচারকারীদের তালিকা প্রস্তুত করে। মামলা হয়েছে। তবে লিবিয়া রুটে মানব পাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সূত্র বলছে- বাংলাদেশের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে গত বছরের ১৭ই সেপ্টেম্বর লিবিয়ার মিসরাতা প্রদেশের দাফনিয়া এলাকায় একটি মানব পাচার চক্রের ঘাঁটিতে অভিযান চালিয়ে ২৫ বাংলাদেশিকে আটক করেছিল দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টাস্ক ফোর্স। ঘাঁটিতে অবৈধ অভিবাসনের জন্য নৌকা তৈরি করা হচ্ছিল। রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পূর্বে এ ঘাঁটির অবস্থান।