শনিবার   ২৮ মার্চ ২০২৬   চৈত্র ১৩ ১৪৩২   ০৯ শাওয়াল ১৪৪৭

১/১১ কুশীলবরা গা ঢাকা দিচ্ছে

হাসান মাহমুদ/মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:৩২ এএম, ২৮ মার্চ ২০২৬ শনিবার

লে: জেনারেল মাসুদ ও খালেদ রিমান্ডে

  
 
লেঃ জেনারেল (অবঃ) মাসুদ ও খালেদ গ্রেফতার হবার পর ১/১১ কুশলীবরা পালাতে শুরু করেছেন। এরাই বেগম খালেদা জিয়ার সরকারকে উৎখাত, তাকে গ্রেফতার ও তারেক রহমানের ওপর নির্মম অত্যারের মদদ দিয়েছেন। অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে তারেক রহমানের ওপর। দেশ ত্যাগে তারা বাধ্য করেছেন। ইতিহাসের পরিক্রমায় এই তারেক রহমানই আজকের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। দায়িত্ব গ্রহণের ২ মাসের মাথায় অত্যাচারিদের পাকড়াও শুরু হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ফুল শয্যায় যাপিত ১১/কর্মকর্তাদের ঘুম হারাম হয়েছে। আতংক ছড়িয়ে তাদেও মধ্যে। আত্মগোপনে চলে গেছেন। আছেন দৌড়ের ওপর। 
আয়নাঘর, গুম, খুন,অপহরণের অন্যতম কুশীলব হিসেবে কুখ্যাতি অর্জনকারী দেশের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা ‘ডিজিএফআই’ সাবেক প্রধান লে: জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেফতারের পর অনুচররা এখন আত্মগোপনে। খালেদ গ্রেফতারের কয়েকদিন আগেই গ্রেফতার হন ওয়ান ইলেভেনের আরেক শীর্ষ কুশীলব, সাভার ক্যান্টনমেন্টের সাবেক জিওসি, লে: জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। বিপুল ভোটে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরপর রাষ্ট্রীয় অপরাধের সঙ্গে জড়িত শীর্ষ ‘সামরিক অপরাধিদের’ বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান নতুন এক মেরুকরণ তৈরি করেছে। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘ডিজিএফআই’-এর দেশব্যাপি নজরদারির বিস্তার ঘটাতে জেলায় জেলায় ওই গোয়েন্দা সংস্থার অফিস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তাদের নেতৃত্বে। জুলাই আন্দোলনের সময় শতশত সাধারণ কিশোর-কিশোরিকে গুলি করে হত্যার আগে তাদেরই অঙ্গুলি হেলনে বিডিআর হত্যাযজ্ঞ, দেশের মেধাবী সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের গুম, খুন, অবৈধ পন্থায় ফাঁসির সঙ্গে তাদের জড়িত থাকা নিয়ে তথ্যপ্রমানসহ বক্তব্যের জোয়ার শুরু হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সাবেক সেনা কর্মকর্তা  ও সাংবাদিক আবু রূশদ তার কোর্সমেট লে: জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ সম্পর্কে গতকাল নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে মামুনের অপকর্মের তথ্য তুলে ধরেছেন। সামরিক পোশাকে তারা অপশাসনকে সমর্থন দিয়ে দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করা, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে সিন্ডিকেট করা, অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়া নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি প্রকাশ পাচ্ছে। গ্রেফতারের পর তাদেরকে রিমান্ডে নিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। গত মঙ্গলবার রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত থেকে নিয়ে যাবার সময় উত্তেজিত জনতা তার দিকে ডিম ও ময়লা নিক্ষেপ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে।  জুলাই গণআন্দোলনের পর তাদের সঙ্গিরা যারা দ্রুত দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের দাবী উঠেছে।
সাম্প্রতিক গ্রেফতার অভিযানের পর দেশের শীর্ষ ‘সামরিক অপরাধিরা’ এখন চরম আতঙ্কে দিন পার করছেন। ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন ২০০৭-২০০৮ সালের সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারে জড়িতরা পলাতক। তৎকালিন সময়ের প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেফতারের পর এই আতঙ্ক ছড়ায়। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদকে গ্রেফতারের পর দাপুটে সেনারা এখন দুশ্চিন্তায় ছড়িয়ে পড়েছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাড়াবাড়ি করার দায়ে আরও অনেকে গ্রেফতারের তালিকায় রয়েছেন বলে ঢাকায় গুঞ্জন রয়েছে।
ওয়ান-ইলেভেনের আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) গত ২৩ মার্চ সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে রাজধানীর বাড়িধারা ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে গ্রেফতার হন। ২৪ মার্চ তাকে আদালতে তোলা হলে পল্টন থানায় দায়ের করা একটি মানব পাচার ও অর্থ আত্মসাৎ মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। বর্তমানে তিনি ডিবি হেফাজতে আছেন। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো, সিন্ডিকেট করে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা এবং দুদকের মামলায় আরও ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও মানি লন্ডারিংয়ের মোট ১১টি মামলা রয়েছে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘অস্বাভাবিক প্রভাবশালী’ কর্মকর্তা হয়ে উঠেছিলেন। ‘গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময় গ্রেফতার ও নির্যাতনের পেছনে তার সরাসরি ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময়ে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে এবং ঢাকার কচুক্ষেতের ডিজিএফআই হেড কোয়ার্টারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং বড় বড় ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে। ওই সময়ে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাও অর্ন্তভুক্ত ছিলেন। দুই নেত্রীকে তখন জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় দুইটি পৃথক বাড়িতে অন্তরীণ রাখা হয়েছিল।    
ডিজিএফআই’র সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে বৃহস্পতিবার ভোররাতে গ্রেফতার করা হয়েছে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকা থেকে। ডিবি পুলিশ গ্রেফতারের পর তাকে আদালতে তোলা হলে মিরপুর মডেল থানায় দায়ের করা জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট একটি হত্যা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, এবং আয়নাঘর তৈরীর নেপথ্যে ভূমিকা রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, সেনাবাহিনীর ‘জলসিঁড়ি আবাসন’ প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তদন্তাধীন।  শেখ মামুন খালেদ ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএআই-এর মহাপরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে ফাসিস্ট সরকারকে সমর্থন দিয়ে সুবিধভোগি হয়েছেন। গত বছর মে মাসে তার ওপর বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাবেক এই দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের পর তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করায় সামরিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে মনে করেন, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে ভবিষ্যতে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করার সাহস দেখাবে না। বিশেষ করে ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। সাবেক জেনারেল মঈন ইউ আহমদসহ অনেকে এখন বিদেশে পলাতক রয়েছেন। পরবর্তিতেও যারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন তাদের মধ্যে জেনারেল (অবঃ) আজিজ আহমেদ ও সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যাংক হিসাব জব্দের পাশাপাশি বিভিন্ন মামলা দায়ের করা হয়েছে। অপরদিকে, ডিজিএফআইয়ের আরেক সাবেক প্রধান সাইফুল আলমের বাসভবন থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৫ জন সামরিক কর্মকর্তাকে জুলাই অভ্যূত্থানে সংশ্লিষ্টতা ও গুমের অভিযোগে হাজির করা হয়। এর মধ্যে মেজর জেনারেল এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও রয়েছেন। ওয়ান ইলেভেন কিংবা বিগত সরকারের সময় যারা অতিউৎসাহী হয়ে কাজ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়।