গণভোট নিয়ে অঘটনের আশংকা
মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৮:১৯ পিএম, ২০ মার্চ ২০২৬ শুক্রবার
রেওয়াজ-রীতির বাইরে স্লোগান, সেলফি তুলার ধুম
সংসদীয় রাজনীতিতে ‘ঈদ বিরতি’ চলছে। সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় তাদের কর্মীদের নিয়ে ঈদ উদযাপনে ব্যস্ত। ঈদের বিরতির পর সংসদের অধিবেশন শুরু হলে এবার সংসদ সদস্যরা কী কান্ড করেন তা নিয়ে নানা গুঞ্জন বাড়ছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ, জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন ইত্যাদি নানা ইস্যুতে ঈদের পরে সংসদ উত্তপ্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোটা এপ্রিল মাস জুড়ে অধিবেশন চলতে পারে। অনেকে প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে এসেছেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এদের নিয়ে খুব বিরক্ত। অনেকে সংসদের রীতিনীতি, রেওয়াজ কিছুই জানেন না। সংসদের অধিবেশনে রাজপথের মতো শ্লোগান দিচ্ছেন। অধিবেশন চলাকালিন অনেক তরুণ সদস্য আসনে বসেই সেলফি তুলছেন। ফেসবুকে দিচ্ছেন। এলাহি এক কান্ড কারখানা! স্পিকার বলেছেন, ‘আগামী দিনে খুব ভোগান্তি পোহাতে হবে বলে মনে হচ্ছে।’
রোজার ঈদের পরে সংসদ উত্তপ্ত হবে জুলাই চার্টার ঘিরে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নিয়েছেন জামায়াত ও এনসিপি সদস্যরা। বিএনপি বলছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে সংবিধানে কিছু নাই। তাই এই পরিষদে শপথ নেওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নিতে হলে প্রথমে এই পরিষদ সংবিধান সংশোধন করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই পরিষদের সদস্যদেরকে শপথ পড়াবেন সেটাও সংবিধানে উল্লেখ থাকতে হবে। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় সংবিধান সংশোধনের এখতিয়ার দলটির আছে। প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি সংবিধান সংশোধন করবে?
জাতীয় সংসদে এখন চলছে রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন চুপ্পুর ভাষণের ওপর আলোচনা। যদিও তাঁর ভাষণ বর্জন করেছিল জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর সমন্বয়ে গঠিত বিরোধী দল। আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি হওয়ায় ভাষণ বর্জন হলেও ভাষণের পুরোটাই বিএনপি সরকারের লেখা। এখানে রাষ্ট্রপতির নিজের কোনও বক্তব্য দেবার সুযোগ নেই। সরকারের বক্তব্য মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর তা পাঠ করেন মাত্র রাষ্ট্রপতি। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির প্রবেশের সময়ে জাতীয় সংগীত বাজলেও বিরোধী দলের কতিপয় সদস্য কিছু সময় বসে ছিলেন। পরে অবশ্য তারা উঠে দাঁড়িয়েছেন। ভাষণ বর্জন করলেও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘন্টা আলোচনার প্রস্তাব করেছেন। এই আলোচনার সময় ও সুযোগ আনুপাতিক হারে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ে পাবে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা ভাষণের বিষয়বস্তুর ওপর সীমিত থাকে না। প্রতিটি সংসদ সদস্যের জন্যে বরাদ্দ সময়ে তারা নিজ নিজ দলের অবস্থান, নিজ নির্বাচনী এলাকার সমস্যা, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি যে কোনও বিষয়ে নিজের জন্য বরাদ্দ সময়ে বক্তব্য রাখতে পারেন। তার ওপর আছে সপ্তাহে একদিন প্রশ্নোত্তর পর্ব। সংসদ সদস্যরা প্রশ্ন করেন। মন্ত্রীরা জবাব দেন। মন্ত্রী তাৎক্ষণিক জবাব না দিতে চাইলে নোটিশ চাইতে পারেন। সময় ফুরিয়ে গেলে সবকিছুই গিলোটিনে দেন স্পিকার। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কোনও মন্ত্রী চাইলে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিতে পারেন। সংসদ সদস্যরা পয়েন্ট অব অর্ডারে বিতর্ক করতে পারেন।
জাতীয় সংসদের রেওয়াজ এবং রীতিনীতি যে শুধু বিরোধী দল ভাঙছে এমন নয়। সরকারী দলও ভাঙছে। এখন একটা কথা সরকারের তরফে বলা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে তার পক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলের যুগ্ম মহাসচিব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। জাতীয় সংসদে এই বিষয়টা একেবারেই নতুন। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি বলতে কিছু নেই। ফলে ব্যাপারটা রেওয়াজ বর্হিভূত হয়ে গেল। এই রকম অনেক কিছুই উল্টাপাল্টা চলছে। বিদায়ী স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী কোথায় এই প্রশ্নের কোনও নিস্পত্তি না করেই খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে দিয়ে সূচনা অধিবেশনে সভাপতিত্ব করানো হয়েছে। যদিও বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালে অনুরূপ পরিস্থিতিতে মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ সূচনা অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
জাতীয় সংসদ এমন কোনও আইন প্রণয়ন করতে পারে না যা সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থি। এমন আইন প্রণয়ন করা হলে আদালতে তা চ্যালেঞ্জ করা যাবে। আদালত তা বাতিল করতে পারে। অপরদিকে, বিরোধী দল বলছে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। কেউ কেউ আবার একটু বাড়িয়ে বলছেন, খোদ সংবিধানই যখন সংস্কারের আওতায় আনার কথা বলা হচ্ছে - এমন ক্ষেত্রে গণভোটের রায়ের আলোকে সব কিছু করা যায়। সংবিধানের প্রশ্ন এখানে আসে না। যদিও এই সরকার এমন কি অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান মেনে গঠিত হয়েছিলো। সংবিধানের আওতাতে সবাই শপথ নিয়েছেন এবং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত বিতর্ক চলতে থাকবে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা সম্ভবত এই বিতর্ক ঘিরেই আবর্তিত হবে। ফলে সামনের সংসদ কঠিন পরি¯ি’তির দিকে যাবে। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের কর্মকান্ডের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে কিনা। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার। অর্ন্তভুক্তিমূলক রাজনীতিতে এতবড় একটা রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতি প্রশ্নের উদ্রেক করতে পারে। যদিও যারা দলটির হালুয়া-রুটির ভাগীদার হয়ে দুর্নীতি করেছেন তাদের কথা আলাদা। বিশ্ব পরিস্থিতি বিশেষ করে জ¦ালানী তেলের দাম সারা দুনিয়ায় বেড়ে যাওয়ায় বিশৃঙ্খলা হচ্ছে দেশে দেশে। এই সংকট বাংলাদেশ কীভাবে শামাল দেবে সেটি নিয়েও জাতীয় সংসদে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।
