শনিবার   ১৪ মার্চ ২০২৬   ফাল্গুন ২৯ ১৪৩২   ২৫ রমজান ১৪৪৭

গণতন্ত্রের শৃঙ্গ জয়ের অভিযাত্রা

মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০২:১৪ এএম, ১৪ মার্চ ২০২৬ শনিবার

তারুণ্যের উদ্দীপনায় পথ হারায়নি বাংলাদেশ

 
 

জুলাই আন্দোলনে তারুণ্যের উদ্দিপনায় পথ হারায়নি বাংলাদেশ। গত ১৬ বছর জনতার পর্বতসম আকাঙ্খা ছিল ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। তরুণ-যুবকরা নিজের জীবন দিয়ে, রক্ত দিয়ে, অঙ্গহানির বিনিময়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে মাঠে নেমেছিল ফ্যাসিস্ট শাসকের বিরুদ্ধে। তবে পেছনে ছিল নানা ষড়যন্ত্র। হাজারো বাধা ডিঙ্গিয়ে গত বুধবার জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শৃঙ্গ জয়ের অভিযাত্রা শুরু হয়েছে। সংসদে আলোচনা শুরুতে যতটা মধুর ছিল, প্রথম অধিবেশনেই বিরোধি দল ‘ওয়াক আউট’ করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্তাপ ছড়ালেও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে। শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচন ব্যবস্থাকে তামাশায় পরিণত করা হয়েছিল। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ভেঙ্গে ফেলার নিকৃষ্ট নজীর ছিল তার শাসনামলে। ফ্যাসিবাদি শাসনের বিদায় হলেও অন্তর্বর্তীকালিন শাসনকালে দেশে বিশৃঙ্খলায় জড়িত ছিল একদল সুযোগ সন্ধানির। তবে নির্বাচন কমিশন ও সেনা সহায়তায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের নজীর স্থাপিত হয়েছে এই বাংলাদেশেই। সেই পথ বেয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের অভিযাত্রা। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, জাতীয় সংসদই হবে সকল সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্লেষকরাও মনে করেন, গণতান্ত্রিক চর্চার এই পথ থেকে বিচ্যুত হলে বাংলাদেশ আবার পথ হারাতে পারে। কারণ সুযোগ সন্ধানিরা সরকারের ‘ইনার সার্কেলে’র ভেতরেই অবস্থান করছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে তুমুল উদ্দিপক, কৌতুহল আর নানা জল্পনায় মিশ্রিত অধ্যায় ছিল। নজীরবিহীন এক নিরাপত্তা বেষ্টনি গড়ে তোলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। অধিবেশনের আগের দিনে সরকারী দল বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী পৃথক সংসদীয় দলের বৈঠক করে। বিএনপি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্ধারণের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর ওপর অর্পণ করে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসাবে নানান জনের নাম ভেসে বেড়ায় সারাদিন। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন ছিলো, প্রথম অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব কে করবেন? সংসদে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সাধারণত বিদায়ী স্পিকার। সেই রেওয়াজ মেনে বিদায়ী স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্ব করার কথা। কিন্তু শিরিন শারমিনের কোনও খোঁজ কেউ জানে না। দ্বিতীয় বিকল্প থাকে ডেপুটি স্পিকার কিন্তু তিনিও কারাগারে অন্তরীণ। এই বাস্তবতায় সংবিধানের আলোকে এবং অতীত নজীর খোঁজে পাওয়া গেল সমাধান। জাতীয় সংসদের জ্যেষ্ঠ কোনও সদস্য প্রথম অধিবেশনের সূচনা লগ্নে সভাপতিত্ব করতে পারেন। ১৯৭৩ সালে একই রকম এক পরিস্থিতিতে জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের সূচনা পর্বে সভাপতিত্ব করেছিলেন। সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সভাপতির নাম প্রস্তাব করার অনুরোধ করা হয়। তারেক রহমান দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতিত্ব করার জন্য নাম প্রস্তাব করেন। সংসদ উপনেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলীয় উপনেতা আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও প্রস্তাবটি সমর্থন করেন। তবে সভাপতির নাম পছন্দের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ না করায় তিনি কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি আহ্বান জানান যে, ভবিষ্যতে সকল সিদ্ধান্ত যেন বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ করে নেওয়া হয়।
খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের বিষয়টি পরিচালনা করেন। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে স্পিকার নির্বাচিত করা হয়। সরকার তাকে প্রথমে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী নিযুক্ত করেছিলো। স্পিকারের দায়িত্ব পাওয়ার পর তাকে সেই পদ ত্যাগ করতে হলো। তবে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয় অপেক্ষাকৃত তরুণ কায়সার কামালকে। যিনি বিএনপি’র আইন বিষয়ক সম্পাদকও। কায়সার কামাল পেশায় একজন ব্যারিষ্টার। কায়সারকে ডেপুটি স্পিকার করাই ছিল বড় চমক। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করার পর পার্লামেন্টের অধিবেশন সাময়িক মুলতবি করা হয়। এই সময়ে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ বাক্য পাঠ করান।
মুলতবির পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের অধিবেশন যাত্রা করে। সেখানে কার্যপ্রণালি বিধি মোতাবেক অনেক কিছুই করা হয়। শেষ দিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় তুমুল হট্টগোল। কারণ রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন চুপ্পু  শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। তাকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি মেনে নিতে পারে না। রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে সংসদে প্রবেশ করলে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। এই সময়টা সবাই দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর হৈ চৈ। জামায়াত ও এনসিপি সদস্যরা কিছু প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে। তারা শ্লোগানও দেয়। তারপরও রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেওয়া অব্যাহত রাখলে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা ওয়াক আউট করেন।
বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, তিন কারণে তারা রাষ্ট্রপতি চুপ্পুকে মেনে নিতে পারছেন না। প্রথমত শেখ হাসিনার আমলে নিষ্ঠুরতার কোন প্রতিবাদ তিনি করেননি। দ্বিতীয়ত তিনি কয়েকটি সাক্ষাৎকার দিয়ে বিষোদগার সৃষ্টি করেছেন। তৃতীয়ত রাষ্ট্রপতি বিগত সরকারের প্রতিভূ। তবে ডা. শফিক এটা বলেছেন যে, তারা পরবর্তী অধিবেশনে জাতীয় সংসদে ফিরে যাবেন। এই বক্তব্যের জবাবে বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ওয়াক আউট সংসদীয় সংস্কৃতিতে নতুন কিছু নয়। তাছাড়া, বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য এই রাষ্ট্রপতির কাছেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে শপথ নিয়েছিলেন।
সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তাপ ছড়িয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হলো। ফ্যাসিষ্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে শতশত মানুষের জীবনহানির ঘটাবার অভিযোগে এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনতার মতামতের ভিত্তিতে বহু বড় দল এক সময় সংকুচিত হতে থাকে। বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের শেষ পরিণতি তারই ধারাবাহিকতায় সম্পন্ন হয়েছে বলে সাধারণ মানুষের অভিমত।