যাত্রা করছে অনেক চমকের সংসদ
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০১:৩৮ এএম, ১০ মার্চ ২০২৬ মঙ্গলবার
অনেক চমকে ভরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনের আর মাত্র একদিন বাকি। ১২ মার্চ বেলা ১১টায় শুরু হচ্ছে সংসদের প্রথম অধিবেশন। অনেক দিক দিয়েই ব্যতিক্রম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। প্রথম দিনই অধিবেশনকক্ষে চিরাচরিত রেওয়াজেরও বিপরীত চিত্র দেখা যাবে। অধিবেশনের শুরুতে স্পিকারের আসন থাকবে শূন্য। অন্যদিকে এমপিদের আসনগুলো প্রায় ভরা। যথারীতি পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের পর অধিবেশন শুরু হলে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুরোধে একজন সিনিয়র এমপি গিয়ে স্পিকারের আসনে বসবেন। এরপর তাঁর পরিচালনায় নির্বাচন করা হবে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার। পরে নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সংসদ সচিবালয়ের শপথকক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ গ্রহণ করবেন। প্রথমবার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েই সংসদ নেতার আসনে বসবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিপরীতে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসবেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। স্বাধীনতার পর এই প্রথমবারের মতো দলটি সংসদের প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে। বিরোধীদলীয় নেতার আসনের পেছনে বসবেন জুলাই গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীদের অন্যতম নাহিদ ইসলাম। এবার সংসদে তাঁর পরিচয় বিরোধীদলীয় চীফ হুইপ। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে পাস হওয়া গণভোট বাস্তবায়ন করা হলে প্রথমবারের মতো চমক থাকছে ডেপুটি স্পিকারের পদ নিয়ে। ওই চেয়ারে এবার বসতে পারেন প্রধান বিরোধী দল জামায়াত মনোনীত কোনো এমপি। সরকারি দলের স্পিকার ও বিরোধী দলের ডেপুটি স্পিকার-এই নতুন আদলের সংসদ কেমন হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও জনগণের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। এবার চিরাচরিত সংসদীয় আচার অনুষ্ঠানে আমূল পরিবর্তন দেখা যাবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। তাঁদের মতে, প্রশ্ন ও উত্তরপর্ব, পয়েন্ট অব অর্ডারের বিষয় থেকে শুরু করে ওয়াকআউট ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রা দেখা যেতে পারে। এত দিন সংসদে যেসব চিরাচরিত বিষয় দেখা গেছে এবারের সংসদে ঠিক তার ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এটা কতটা যুগোপযোগী হবে, তা সময় বলে দেবে বলে জানান সংসদ নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার পদ নিয়ে চলছে ব্যাপক জল্পনা। বিএনপির হাইকমান্ড থেকে কয়েকজনের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ মুহূর্তে বড় কোনো ‘চমক’ আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। একইভাবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ডেপুটি স্পিকার দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে দলটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানা গেছে। সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের জন্য তাদের একজন এমপিকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। সম্প্রতি সরকারি দলের চিফ হুইপ ও ছয়জন হুইপ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চিফ হুইপ নিযুক্ত হয়েছেন নুরুল ইসলাম মনি (বরগুনা-২)। নিয়োগ পাওয়া ছয়জন হুইপ হলেন জি কে গউস (হবিগঞ্জ-৩), রকিবুল ইসলাম (খুলনা-৩), মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু (শরীয়তপুর-৩), অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু (নাটোর-২), মো. আখতারুজ্জামান মিয়া (দিনাজপুর-৪) ও এ বি এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান) (লক্ষ্মীপুর-৪)। সব মিলিয়ে এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নবগঠিত সংসদের নতুন সমীকরণ। এবারের সংসদে যেমন রাজপথের লড়াকু তরুণ নেতাদের অভিষেক হচ্ছে, তেমনি অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীর পরাজয় ও নতুন দলের আবির্ভাব রাজনীতিতে এক বড় চমক হিসেবে দেখা দিয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্যই এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছয়জন তরুণ প্রতিনিধিও সংসদ সদস্য হয়েছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে বড় চমক দেখিয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপির লুৎফুজ্জামান বাবর ও জামায়াতে ইসলামীর এ টি এম আজহারুল ইসলাম। দীর্ঘ দেড় দশক কারাগারে থাকার পর মুক্তি পেয়েই তাঁরা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
নতুন সংসদের কাছে কী ধরনের প্রত্যাশা রয়েছে, জানতে চাইলে সংসদ নিয়ে নিয়মিত কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সংসদ কার্যকর হবে এটাই প্রত্যাশা। পাশাপাশি সংসদ তার ভূমিকা পালন করবে। তিনটা মৌলিক ভূমিকা যেমন আইন প্রণয়ন, জনস্বার্থে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা পালন ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে এটা কোনো দলের সংসদ নয়, এটা জাতীয় সংসদ। গণভোটে পাস হওয়া জুলাই জাতীয় সনদ কতটা বাস্তবায়ন করা হতে পারে প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা নির্ভর করছে সংসদের সদিচ্ছার ওপর। এজন্য মূল দায়িত্ব সরকারি দলের। তিনি বলেন, গণভোটের অনেক প্রস্তাব রয়েছে যেগুলোতে সব দলের শতভাগ ঐকমত্য রয়েছে। নোট অব ডিসেন্টও নাই। যেমন জুলাই সনদের ৭৪ নম্বর ধারায় আছে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে সব এমপি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আয়-ব্যায়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে ও প্রতি বছর তা নবায়ন করতে হবে। এ কাজটা আমরা তিন মাসের মধ্যে দেখতে চাই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংসদ দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। ত্রয়োদশ সংসদকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পাসের মাধ্যমে আইনি বৈধতা দিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সংবিধান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল সংস্কারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি অংশগ্রহণ করলেও শেষ পর্যন্ত সংসদে ৯টি দলের প্রতিনিধিত্ব দেখা যাচ্ছে। বিএনপির ২০৯ জন বিজয়ী সদস্যের মধ্যে ১৩২ জনই নতুন মুখ, এবং জামায়াতে ইসলামীর ৫৯ জনই প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথমবারের মতো ৪টি ইসলামি দল সংসদে আসন লাভ করে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী এক বিশেষ রাজনৈতিক আবহে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ করায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি।
