শনিবার   ০৭ মার্চ ২০২৬   ফাল্গুন ২২ ১৪৩২   ১৮ রমজান ১৪৪৭

ইরান কি আরেকটি গাজা হবে?

মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৫:৩৮ এএম, ৭ মার্চ ২০২৬ শনিবার


 

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলেছে। যুদ্ধ বন্ধের কোনও লক্ষণ নেই। বরং ইরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জড়িত হয়ে তেহরানের ওপর যৌথ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ বিশারদরা বলছেন, ইরানকে গাজা বানাতে ইহুদিরা জোট বেঁধেছে। আরব বিশ্ব তা বাস্তবায়নে ট্রাম্পের পুতুলে পরিণত হয়েছে।মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত কওে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায় ট্রাম্প ও নেতানেহু।  প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধের টার্গেট রেজিম চেঞ্জ। তবে কার্যত হামলার ধরন দেখে স্পষ্ট যে, উপর্যপরি হামলা চালিয়ে ইরানকে বশীকরণ। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পরও তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করে ক্ষেপনাস্ত্র হামলা পরিচালনা করছে। তবে ধ্বংসযজ্ঞ ও হতাহতের সংখ্যা বিবেচনায় ইরানের ক্ষতি অনেক বেশি। এসব হামলায় ইরানের এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সেই তুলনায় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হতাহত একেবারে কম। যদিও ঢাকায় ইরানি কালচারাল কাউন্সেলর সৈয়দ রেজা মির মোহাম্মদি বলছেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তাতে তার ধারণা এই দুই দেশের নিহতের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০ হবে। তবে এসব সংখ্যার কোনও ভিত্তি নেই। যুদ্ধে হতাহতের সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। তেহরান প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইরানের পাল্টা ক্ষেপনাস্ত্র হামলাতেও ক্ষয়ক্ষতি কম নয়। তবে যুদ্ধ কত দিন চলবে সেটাই বিবেচ্য।
যুদ্ধের ব্যাপকতা বেড়েই চলেছে। ইসরায়েল বলেছে, তারা তেহরানের হামলা জোরদার করেছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংস করতে সচেষ্ট রয়েছে। অপরদিকে, ইরান বলছে, তারা বাহরাইনে অ্যামাজানের ডাটা সেন্টার ধ্বংস করেছে। মার্কিন সিনেটে আনা একটি প্রস্তাব ট্রাম্পকে ইরানে সামরিক অভিযান বন্ধে সমর্থ হয়নি। সিনেটে ৫৩-৪৭ ভোটে প্রস্তাবটি আটকে গেছে। ইরানের পক্ষে প্রক্সি বাহিনী হিসাবে হিজবুল্লাহ, হুথি এবং হামাসের হামলার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের সুন্নি কুর্দি সম্প্রদায়কে অস্ত্র দিয়ে সংঘাতে জড়িত করতে চাইছে। তবে ইরাকেও যথেষ্ঠ সংখ্যক শিয়া সম্প্রদায় রয়েছেন। ইরানের ওপর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। ট্রাম্প অবশ্য বলছেন, যুদ্ধ শেষ হতে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগবে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ তার চেয়েও দীর্ঘ হতে পারে। 
ইরানের হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনে দু’জন পৃথক বাংলাদেশী মারা যাওয়ায় বাংলাদেশ নিন্দা জানিয়েছে। যদিও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশ শোক প্রকাশ করেছে। শোক জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম ঢাকায় ইরানী দূতাবাসে খোলা শোক বইয়ে সই করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে ইরানের হামলার কারণে বাংলাদেশীদের জন্যে ঝুুঁকির কারণ হয়েছে। এই কারণে বাংলাদেশ যুদ্ধ চায় না। বাংলাদেশ চায়, কূটনৈতিক টেবিলে আলাপ-আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে যে কোনও সমস্যার সমাধান। 
মধ্যপ্রাচ্যের যে সকল দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে তার সব ক’টিতেই হামলা চালিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নৌঘাটি বাহরাইনে অবস্থিত। ইরানী হামলার পর বাহরাইন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থেকে সৈন্য সরিয়ে নিয়েছে। এছাড়াও, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ থেকে যুক্তরাষ্টের সামরিক ও বেসামরিক লোকজন সরিয়ে নিয়েছে। তবে ইরানি কাউন্সেলর বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক স্থানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। তাই ক্ষেপনাস্ত্র হামলাও অব্যাহত থাকবে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা একটা অসম যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক শক্তি অনেক বেশি। সেই তুলনায় ইরান খুবই দুর্বল। ফলে রেজিম চেঞ্জ সম্ভব না হলেও বিমান হামলা চালিয়ে দেশটাকে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে নতুন এক গাজায় রুপান্তর করার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে যথারীতি অফিস করছিলেন। ওই সময়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করে। এই পর্যায়ের নেতাদের বলা হয় ‘সেন্টার অব গ্রেভেডি’ অর্থাৎ যার নেতৃত্বে কোনও একটা জাতি যুদ্ধ করে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেন কিংবা লিবিয়ায় কর্ণেল মুয়াম্মার গাদ্দাফিও গ্রেভেডি সেন্টার। এদের হত্যার মাধ্যমে জাতি দিশেহারা হয়ে পড়বে। আর এভাবে কোনও যুদ্ধে জয়ের নিশানা খোঁজা হয়। ইরানের ক্ষেত্রে এই কৌশল কাজ করেনি। বরং ইরানিরা অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে কোনও মিত্র না থাকায় দেশটি কূটনৈতিকভাবে একা হয়ে পড়েছে। চীন ও রাশিয়া যদিও ইরানের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে; কিন্তু সামরিক সহযোগিতা কিছু করেনি। অপরদিকে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছে ফ্রান্স। ইরানে হামলায় ফ্রান্স তার সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে রাজি।
ইরান তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামিনীকে হারানোর পর নতুন নেতা নির্বাচনে সময় নিচ্ছে। ইরানের আইনে সর্বোচ্চ নেতা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে কিংবা মারা গেলে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিষদ দেশ পরিচালনা করার বিধান আছে। এই তিন সদস্য হলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং অভিভাবক পরিষদের প্রধান। বর্তমানে তিন সদস্যের পরিষদই দেশ পরিচালনা করছে। শীর্ষ নেতা নির্বাচন করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ৮০ জন আলেম। ইরানের কর্তৃপক্ষ ধারণা করেছে যে, ৮০ জন আলেক একত্রে কোনও বৈঠকে মিলিত হলে সেখানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথ বিমান হামলা চালিয়ে তাদের সবাইকে হত্যা করতে পারে। কিংবা নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করলে তিনিও বিমান হামলার টার্গেট হতে পারেন। তাই নতুন নেতা নির্বাচনে সময় নিচ্ছে দেশটি। যদিও খোমেনির মেঝো ছেলে মুজতবা খোমেনির নাম নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে আলোচনা হচ্ছে। প্রায় ৬০০০ বছরের পুরনো পারস্য  সভ্যতা তথা ইরান ইসলামী বিপ্লবের পূর্বে মার্কিন অনুগত শাসক রেজা শাহ পাহলভির অধীনে ছিলো। পাহলভি ছিলেন উদার ও নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। নারীদের বাদ্যতামূলক ড্রেস কোড ছিল না। নির্বাসিত নেতা খোমেনির নেতৃত্বে পাহলভির বিরুদ্ধে ইসলামী বিপ্লব সাধিত হয় ১৯৭৯ সালে। ওই বছর পাহলভি পালিয়ে মিশরে আশ্রয় নেন। যুক্তরাষ্ট্রও তাকে আশ্রয় না দেওয়ায় তিনি মিশরেই মারা যান। তবে তার স্ত্রী ও ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করেন। রিজিম চেঞ্জ করে পাহলভিদের ক্ষমতায় বসানোর টার্গেট নিয়েছিলেন ট্রাম্প। 
ইরানের সঙ্গে জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে যখন রিজিম চেঞ্জ সম্ভব হয়নি তখনই খোমেনিকে হত্যার টার্গেট নেন। এবার বিমান হামলায় বিপর্যন্ত ইরানকে স্থল হামলা করা কঠিন। ভৌগোলিকভাবে দেশটির কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্থল হামলা জটিল করে ফেলেছে। মরুভূমি, সাগর, পাহাড়ের মিলিত ভূ-প্রকৃতি; চীন, রাশিয়া, তুরস্ক আর ইরাক বেষ্টিত কৌশলগত অবস্থানের কারণে তেল ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ইরানকে স্থলযুদ্ধে কব্জা করা প্রায় অসম্ভব। তার ওপর ইরানের রয়েছে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের এক পঞ্চমাংস তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে। কাতার এনার্জির ওপর ইরানের হামলার ফলে বাংলাদেশে তেলের সংকট হতে পারে। কাতার এনার্জি তেল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান প্রধানত কাতারের কাছ থেকে এলএনজি আমদানি করে থাকে। ফলে সংকট দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বেশি। চীন অবশ্য এলএনজি আমদানি করে অষ্ট্রেলিয়া থেকে। ফলে তাদের সংকট কম। জনশক্তি, জ¦ালানী ও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশ এই যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করে কূটনৈতিক পথে সংকট সমাধানের আহ্বান জানায়।