মঙ্গলবার   ০৩ মার্চ ২০২৬   ফাল্গুন ১৮ ১৪৩২   ১৪ রমজান ১৪৪৭

জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:১৫ এএম, ৩ মার্চ ২০২৬ মঙ্গলবার

ইরানে হামলার আগুন এখন গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইনে মার্কিন অবস্থান লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে আয়াতুল্লাহ খামেনির দেশ। অর্থাৎ এই যুদ্ধ এখন আর ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর আগুন উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এসব দেশের সাধারণ মানুষকে ড্রোন হামলার সময় ছুটে পালাতে দেখা যায়। বিশ্লেষকরা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার চাপে ফেলতেই উপসাগরীয় দেশগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন পাঠাচ্ছে তেহরান। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে দেশটি। ড্রোনের আঘাত পড়ছে তেল শোধনাগারের ওপর। এতে তেলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আল জাজিরার খবর, সৌদি আরবের সর্ববৃহৎ তেল শোধনাগার রাস তানুরায় হামলা হয়েছে। এতে দেশটির তেল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মিডিয়ার খবর, গত তিনদিনে সৌদির ৬৮ শতাংশ তেল উৎপাদন কমে গেছে। হামলার প্রভাব ইউরোপের তেলের বাজারেও পড়েছে। সেখানে তেলের দাম ২২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
Advertisement: 0:09
Unibots.com

এদিকে ইরানের মিত্র শক্তিগুলোও জেগে উঠেছে। হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যেই ইসরাইলে হামলা শুরু করেছে। ওদিকে হুতিদের মধ্যেও নড়াচড়া শুরু হয়েছে। সশস্ত্র এই গ্রুপটির প্রধান আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যার কঠোর প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেছে। এর প্রেক্ষিতে ইসরাইল হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করেছে। এতে অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর প্রধান নাইম কাসেমকে টার্গেট করেছে তেল আবিব।

প্রথম দুইদিনের তুলনায় ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বাহিনী। রেড ক্রিসেন্টের তথ্য বলছে, হামলায় ইরানের ১৩১টি শহর আক্রান্ত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা ৫৫০ ছাড়িয়েছে। বেসামরিক লোকজন হতাহত হচ্ছেন। ইরানও যথাসম্ভব জবাব দিচ্ছে। কুয়েতে মার্কিন তিনটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে দেশটি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকনেও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান। এই প্রথম নিজেদের সৈন্য নিহতের খবর স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটগুলো গণহারে বাতিল করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আল জাজিরার খবর, গত কয়েকদিনে মধ্যপ্রাচ্যগামী অন্তত ৩৪০০ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে হামলার দাবি: ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বিমান বাহিনী প্রধানের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরজিসি’র বিবৃতি উদ্ধৃত করে এই তথ্য জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, জায়নবাদী শাসনের অপরাধী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিমান বাহিনী প্রধানের সদর দপ্তরকে লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি’র দাবি, হামলায় ‘খাইবার’ নামের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তবে হামলার ফলে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ইরানের ১৩১ শহর আক্রান্ত: ইরানে গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় এ পর্যন্ত ১৩১টি শহর আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষ। বিবৃতিতে নিহতের সংখ্যাও উল্লেখ করেছে তারা। রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, সোমবার পর্যন্ত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জায়নবাদী ও মার্কিনদের যৌথ সন্ত্রাসী হামলার কারণে এখন পর্যন্ত ১৩১টি শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হতাহতের আসল চিত্র: ইরান, ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের তৃতীয় দিনে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত তিনদিনে এই যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। এখানে বলে রাখা ভালো- আন্তর্জাতিক মিডিয়া ইসরাইল থেকে সঠিক তথ্য সরবরাহ করতে না পারায় আসল সংখ্যা জানা কঠিন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ইরানে। দেশটির রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বিমান হামলায় ইরানে নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৫৫ জন। এর মধ্যে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলেই নিহত হয়েছেন ১৫০ জন শিক্ষার্থী। আহত হয়েছেন ৭৪৭ জন।
ইরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিশোধমূলক হামলায় ইসরাইলের ভেতরেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৩ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১লা মার্চ বেইত শেমেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৯ জন এবং তেল আবিবে ২ জন নিহতের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া কয়েক ডজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ হয়েছেন অন্তত ১১ জন ইসরাইলি।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড প্রথমবারের মতো এই অভিযানে তাদের সেনাদের প্রাণহানির কথা স্বীকার করেছে। এ পর্যন্ত ৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে তারা। আহত হয়েছেন ৫ মার্কিন সেনা। এ ছাড়া কুয়েতে ৩টি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে এতে পাইলটরা অক্ষত আছেন।

এই সংঘাতের জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং জর্ডানেও ইরানের ছোড়া মিসাইল ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩ জন নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়েছেন। কুয়েতে নিহত হন ১ জন। আহত হন ৩২ জন। বাহরাইনে ১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

কতোদিন চলবে এই যুদ্ধ: লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা চলবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ঠিক কতোদিন এই যুদ্ধ স্থায়ী হবে নিশ্চিত না করলেও সম্ভাব্য সময়সীমা জানিয়েছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধ চার সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এদিকে সোমবার এই যুদ্ধ নিয়ে ব্রিফিং করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, অন্তহীন কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিফিংয়ে হেগসেথের সঙ্গে জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সাফ জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ কোনো ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ পরিণত হবে না। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, নৌবাহিনী এবং নিরাপত্তা অবকাঠামো ধ্বংস করতে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে হামলা চালাচ্ছে। পেন্টাগনের মতে, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীগুলো যেন আর হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জিত হলেই অভিযান স্থগিত করা হবে। আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো বলছে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর।

ইরানে হামলায় ট্রাম্পের ক্ষমতা কমাতে মার্কিন আইনপ্রণেতার উদ্যোগ: মার্কিন কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে ইরানে এত বড় হামলা চালাতে পারেন কিনা প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এ নিয়ে কথা উঠেছে। সচেতন আইন প্রণেতারা এর বিরুদ্ধে কথা বলছেন। সর্বশেষ মার্কিন সিনেটর অ্যাডাম শিফ বলেন, তিনি অন্য আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে যোগ দেবেন একটি ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলুশন’-এর ওপর ভোট বাধ্যতামূলক করতে। এই ভোট ট্রাম্পের ইরানে হামলার ক্ষমতা সীমিত করবে।

এক্সে দেয়া এক পোস্টে শিফ লিখেছেন, ‘যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি সিনেটর টিম কেইন, র‌্যান্ড পল এবং শুমারের সঙ্গে যোগ দিচ্ছি আমাদের ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলুশনের ওপর ভোট নিশ্চিত করতে, যাতে স্পষ্ট করা যায়: কংগ্রেস আমাদের সামরিক বাহিনী ব্যবহারের এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেনি।’ এই প্রস্তাবটি যদি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষেই পাস হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সামরিক হামলা চালানোর আগে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে বাধ্য হতে হবে। তবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না থাকলে ট্রাম্প এই প্রস্তাবে ভেটো দিতে পারেন, যা অর্জন করা সম্ভবত কঠিন হবে। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, কেবল কংগ্রেসই যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে।

তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, শেয়ারবাজারে পতন
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী হামলার প্রভাব মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ বেড়েছে। শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছে পতন। সোমবার সকালে এশিয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। পরে কিছুটা স্থিতিশীল হলেও টোকিও সময় দুপুর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের এই তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৬.৪৮ ডলারে দাঁড়ায়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলো নিম্নমুখী হয়ে লেনদেন শুরু করে। হংকংয়ের হ্যাং সেন সূচক প্রায় ২ শতাংশ এবং জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক প্রায় ১.৫ শতাংশ কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত লেনদেনের সময়ের বাইরে যে স্টক ফিউচারস লেনদেন হয়, সেগুলোতেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। যা ওয়াল স্ট্রিটে অস্থির দিনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মানদণ্ড এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট সূচকের ফিউচারস- দু’টিই প্রায় ০.৭ শতাংশ করে কমেছে।

ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা: ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এতে কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের পরমাণুবিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থায় নিযুক্ত ইরানের দূত রেজা নাজাফি। সোমবার এ কথা জানান তিনি। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ৩৫ সদস্য দেশের বোর্ড অব গভর্নরস-এর বৈঠক হয়। ওই সময় সাংবাদিকদের নাজাফি বলেন, রোববার তারা আবারও ইরানের শান্তিপূর্ণ ও সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে হামলা করেছে।