শনিবার   ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   ফাল্গুন ১৫ ১৪৩২   ১১ রমজান ১৪৪৭

তারেকের নজর ক্যান্টনমেন্ট ও প্রশাসনে

হাসান মাহমুদ/মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:২২ এএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার


 

বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই রাষ্ট্রের শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবল করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে কিছু রদবদল একেবারেই রুটিন বলে সরকারের পক্ষে দাবি করা হয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের শুদ্ধি রদবদল অভিযানের শেষ এখানেই থেমে যাবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সিভিল প্রশাসন ও ক্যান্টনমেন্টের দিকেই তার নজরদারি। নিজের ও সরকারের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তাঁর এই নজরদারি চলছে বলে জানা যায়। শীর্ষ কিছু পরিবর্তন চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এদিকে বিরোধি দল জামায়াতে ইসলামি সরকারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি তাঁর শপথ ভঙ্গ করেছেন। সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার চরম বিরোধিতা করা হয়েছে জামায়াতের পক্ষ থেকে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, গভর্নর, কূটনীতিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন চলছে। সরকারের এসব নিয়োগ নিয়ে অচিরেই বিরোধি দলের পক্ষ থেকে জোরালো জবাবের প্রস্তুতি চলছে বলে আভাস মিলেছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ রদবদলের কয়েকদিন পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার সিনিয়র পর্যায়ে আরেক দফা ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজুর রহমানকে ঢাকার জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজের (এনডিসি) নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সরিয়ে দিয়েছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজুর রহমান, যিনি ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাকে উৎখাতের পরপরই ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)-এ ছিলেন। তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নেতৃত্বাধীন শিবির ব্যতীত অন্য একটি ‘শিবির’-এর অন্তর্ভুক্ত জেনারেলদের একটি ছোট বৃত্তের মধ্যে ছিলেন বলে সন্দেহ করা হতো। গুন খুনের অভিযোগে বন্দি সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান জিয়াকে গত সপ্তাহে আদালতে আনার সময় তিনি চোখে সানগ্লাস পড়েছিলেন। চেহারায় ছিল হাসি হাসি ভাব। এর আগে ট্রাইব্যুনালের আলোচিত প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। যাকে ওই পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাকে নিয়েও বিতর্ক চলছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিদায়ী এনডিসি কমান্ড্যান্ট, লেফটেন্যান্ট জেনারেল শাহিনুল হক, যিনি ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে অবসর নেবেন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজুর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হবেন। এই মূল পরিবর্তন ছাড়াও, পাঁচজন মেজর জেনারেলকেও তাদের দায়িত্ব থেকে স্থানান্তরিত করা হয়। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মোহাম্মদ নাসিম পারভেজ। যাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমওএফএ) বদলি করা হয়েছে। ১৯তম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং এবং টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরমেশনের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন আল মোর্শেদ নতুন অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন। তিনি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হাকিমউজ্জমানের স্থলাভিষিক্ত হবেন যিনি এম.আই.এস. টি কমান্ড্যান্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। রংপুরের ৬৬তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে ঢাকার লগ এরিয়ার দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে ভারতপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী জেনারেলদের উপস্থিতির কারণে সীমাবদ্ধ ছিলেন। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান। যাঁকে এম. ও. এফ. এ-তে পাঠানো হয়েছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের প্রধান সমর্থকদের মধ্যে ছিলেন, যিনি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে নতুন করে দায়িত্ব পেলেন। যার নিয়োগ নিয়ে নানা উষ্মা চলমান রয়েছে। মনে করা হয়, খলিলুর রহমান ছিলেন মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিতর্কিত ‘মানবিক করিডোর’-এর প্রধান স্থপতি। যাতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসান অবিরাম সমর্থন দিয়েছেন। এই ‘মানবিক করিডোর’-এর চরম বিরোধিতা করেছে ভারত সরকার।
বিএনপি নেতা ড. মঈন খানকে প্রথম অধিবেশনে স্পিকার করা হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। জয়নুল আবেদীন ফারুক হতে পারেন ডেপুটি স্পিকার। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী আশা করছে ডেপুটি স্পিকারের পদ। বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশারফ হোসেনকে নতুন রাষ্ট্রপতি করার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে। এছাড়াও ৫০ জন নারী সংসদ নির্বাচন হতে পারেন সংসদে। বিএনপি ৩৫ জন, জামায়াতে ইসলামী ১১ জন এবং এনসিপি একজন নারী সংসদ সদস্য পাবে। বিরোধী দল ইতিমধ্যে ডা. শফিকুর রহমানকে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা, ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে বিরোধী দলীয় উপনেতা এবং এনসিপি’র নাহিদ ইসলামকে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মনোনীত করেছে।
নতুন সরকারের রদবদলে সবচেয়ে চোখে পড়েছে সেনাবাহিনীর কমান্ডিং পজিশনে উল্লেখযোগ্য রদবদল। ১৯ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও ঘাটাইল এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল হোসেন আল মোরশেদকে সেনা সদর দপ্তরের নতুন অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, বর্তমান অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামানকে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (মিস্ট)-এর নতুন কমান্ড্যান্ট করা হয়েছে।
মেজর জেনারেল মো. নাসিম পারভেজ, যিনি মিস্ট-এর কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব পর্যায়ের আরও পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও রংপুর এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের লজিস্টিকস এরিয়ার জিওসি ও এরিয়া কমান্ডার হিসেবে বদলি করা হয়েছে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের লজিস্টিকস এরিয়ার সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল মুহাম্মদ মোস্তাগৌসুর রহমান খান নিয়মিত অবসরে গেছেন। এর আগে ২২ ফেব্রুয়ারি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমানকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি এর আগে আর্মড ডকট্রিন অ্যান্ড ট্রেনিং কমান্ড (এআরটিডিওসি)-এর জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এছাড়াও, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আরও কয়েকটি শীর্ষ পদে রদবদল করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত আদেশ গত রোববার দুপুরে সেনা সদর দপ্তর থেকে জারি করা হয়। বর্তমান প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে।
মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমানকে নতুন প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি এর আগে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেজর জেনারেল জে এম ইমদাদুল ইসলামকে ৫৫ পদাতিক ডিভিশন থেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে বদলি করা হয়েছে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মেজর জেনারেল ফেরদৌস হাসানকে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে কমরত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাফিজুর রহমানকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরীকে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)-এর মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বেসামরিক রদবদলে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে রদবদলের ঘটনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে অনেকটা মব সৃষ্টি করে সরানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারীরা তার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভের মুখে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক ত্যাগ করেন। এর কিছুক্ষণ পরে তার একজন উপদেষ্টাকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লাঞ্চিত করে বিদায় দেন। এই প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রদবদলের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সরকার ব্যবসায়ী মোঃ মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়ার পর চারদিকে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। যদিও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একাউন্টিংয়ে অনার্স ও মাস্টার্স। তিনি একজন গার্মেনটস ব্যবসায়ি। বিএনপির নির্বাচনি পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে প্রথমবারের মতো একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করাকে ঘিরে। বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অনেক গোপনীয় এবং স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এসব সিদ্ধান্ত সরাসরি ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব ফেলে। অতীতে কোনও ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডে রাখা হয়নি। এবার রীতিমত গভর্নর করা হলো যা নিয়ে বিতর্কের ঝড় বইছে। মোঃ মোস্তাকুর রহমান একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ি। হিরা সোয়েটার্স নামে তার একটি গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে।
এছাড়াও, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ বেশ কয়েকজন সচিব, পুলিশ প্রধান, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিটি) চীফ প্রসিকিউটরসহ বিভিন্ন পদে রদবদল হয়েছে। এই রদবদল প্রক্রিয়া আরও কিছুদিন চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এমপিগণ শপথ গ্রহণ করেন। একই দিন বিকালে শপথ নেয় নতুন মন্ত্রিসভা। ৫০ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিসভার পাশাপাশি ১০ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদও গঠন করা হয়েছে। আগামী ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। প্রথম দিনেই বিরোধি দলের প্রচন্ড চাপের মুখে পড়তে পারেন বিএনপির এমপিরা।