শনিবার   ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   ফাল্গুন ১৫ ১৪৩২   ১১ রমজান ১৪৪৭

বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে এই ঘোলাটে অবস্থা হল কেন

আরশাদ মাহমুদ

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:১৪ এএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার



অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আহসান মনসুরকে বিদায় দিয়ে তার জায়গায় মুস্তাকুর রহমান নামে একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
স্বাভাবিকভাবে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে। কি অবস্থায় এবং কোন বিবেচনায় তারেক রহমানের সরকার এই কাজটি করল সেটা সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, যে বিতর্ক শুরু হয়েছে তা হয়তো আর কিছুদিন চলবে এবং এক সময় মিডিয়া অন্য কোন নতুন ইস্যু সামনে নিয়ে আসবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বিতর্ক তখন হারিয়ে যাবে। তবে দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় এটা বলতে পারি তারেক সরকার এটা জেনেশুনেই এবং চিন্তাভাবনা করেই করেছে। এটা নিয়ে যে হইচই হবে সেটাও তারা জানতো। তার একটা প্রমাণ পেলাম অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের একটা মেটার অফ ফ্যাক্ট বক্তব্যে। এক সাংবাদিক এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, এই পরিবর্তনগুলো হচ্ছে এবং সামনে আরো হবে। পিরিয়ড। 
মোটা দাগে ব্যাপারটা হল-- আমরা আমাদের যা করণীয় সেটা করবো এবং কে কি বলল, না বলল তাতে আমাদের খুব একটা কিছু আসে যায় না। অনেকটা আগের সরকার গুলোর মতই এদের আচরণ। তাদের এই বক্তব্যে বুঝতে পারি, এটা তারেক রহমানের 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান' এর অংশ। আপনারা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি ইউনুস সাহেবের সেই বিখ্যাত 'মেটিকুলাস ডিজাইন'। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দেশের সাধারণ মানুষ এই পৎুঢ়ঃরপ বক্তব্যগুলোর মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকবে অনবরত।
আজ হোক বা কাল হোক আহসান মনসুরকে যেতে হতো। তবে যে প্রক্রিয়ায় তাকে বিদায় দেয়া হলো সেটা আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি। তিনি খুবই দক্ষ এবং দেশের এক সংকটকালে খুব ভালো কাজ করেছেন বলে অনেকেই মন্তব্য করছেন। আমি এর সঙ্গে একমত নই। এ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে তার সম্পর্কে কিছু তথ্য দেই। 
আমার সঙ্গে তার একবারই মাত্র দেখা হয়েছে ২০০৫ সালে ওয়াশিংটনে। তিনি তখন আইএমএফ এ কর্মরত ছিলেন। এর পরের বছর আইএমএফ আর্থিক সংকটে পড়ে এবং তারা অনেককে ছাটাই করতে বাধ্য হয়। তখন সংস্থাটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ থেকে চলে যাওয়ার জন্য গোল্ডেন হ্যান্ডসেক প্রোগ্রাম চালু করে। আহসান মনসুর সেই প্রোগ্রামে আইএমএফ থেকে বিদায় নেন। সেই সময় তার দাম্পত্য জীবনেও গুরুতর সমস্যা দেখা দেয় এবং কিছুদিনের মধ্যে তার স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এর কিছুদিন পর আহসান মনসুর দেশে ফিরে আসেন এবং বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা সাদিক আহমেদের সঙ্গে মিলে চড়ষরপু জবংবধৎপয ওহংঃরঃঁঃব নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লেখ্য, সাদিক সাহেবও তখন বিশ্ব ব্যাংক থেকে অবসরে গেছেন, কারণ তার আর উপরে ওঠার স্কোপ ছিল না। 
যাহোক ২০২৪ এর বিপ্লবের পর আহসান মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর হিসেবে যোগ দেন। নিয়োগ পাওয়ার পরপরই তিনি বললেন, টাকা ছাপিয়ে আর কোন ব্যাংককে রক্ষা করা হবে না। পরিতাপের বিষয় এর কিছুদিন পরই এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য পাবলিক স্টেটমেন্ট ছিল পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। এটা নিয়ে অনেক দৌড়ঝাপ শুরু হয়। কিছুদিন পর তিনি বললেন ব্যাপারটা জটিল এবং সময় লাগবে; পাঁচ বছরের আগে কিছুই হবে না। 
কিন্তু এরপরও তার দৌড়ঝাঁপ থেমে থাকে নি। বিভিন্ন সূত্রের খবরে প্রকাশ, প্রথম চোদ্দ মাসে তিনি বিশ বারের অধিক বিদেশে গেছেন এবং মোট একশো দিন বিদেশে অবস্থান করেছেন সবই সরকারের টাকায়। এ ব্যাপারে তিনি তার নিয়োগকর্তা ইউনুস সাহেবকে ছাড়িয়ে গেছেন। আমি কয়েকবার এগুলো নিয়ে লিখেছিলাম এবং সাংবাদিকদের অনুরোধ করেছিলাম আপনারা ব্যাপারটা একটু ইনভেস্টিগেট করেন। পরিতোপের বিষয় এটা নিয়ে কোন রিপোর্ট এ পর্যন্ত দেখিনি। 
যা হোক তার সময়কালে সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে যখন তিনি বসুন্ধরা গ্রুপের কর্ণধার আকবর সোবহানকে তার অফিসে আমন্ত্রণ জানান। আপনারা জানেন সোবহান ধর্ষণ, খুন এবং অর্থপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত। তিনি দুদকের করা মামলার আসামী। এরকম একজন ব্যক্তিকে সে কিভাবে তার অফিসে আমন্ত্রণ জানাতে পারে? এটা নিয়ে সেই সময় অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়েছিল। 
তখনকার আরেকটি ঘটনাও ছিল আলোচনার বিষয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের রিপোর্ট করে যে ২০২৪ সালের নভেম্বরে মনসুরের মেয়ে ২৩ কোটি টাকায় দুবাইতে একটা ফ্ল্যাট কেনে। ঘটনাটি প্রকাশ হলে মনসুর সাহেব বলেন তার মেয়ে নিজের ইনকামের টাকায় সেটা কিনেছে ২০২৩ সালে। কিন্তু তখন পুরো টাকা পরিশোধ করা হয়নি। দলিল এবং অন্যান্য এভিডেন্স প্রডিউস করে সাংবাদিক সায়ের বলেন যে সেই টাকা পরিশোধ হয়েছে তার পরের বছর নভেম্বর মাসে। অর্থাৎ আহসান মনসুর গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে। তার ট্রাভেল রেকর্ড দেখলে জানা যাবে যে তিনি অনেকবারই দুবাইতে গেছেন। দুবাই সহ অন্যান্য অনেক জায়গায় গেছেন এবং সেটার ব্যাখ্যা ছিল পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্য তাকে বিদেশে যেতে হয়। যদিও ওই অর্থ সহসা ফেরত আনা যাবে না এটা তিনি নিজেই বলেছেন। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে তাহলে তিনি এতবার বিদেশ গেলেন কেন?
নতুন গভর্নর মুস্তাকুর রহমান সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য এখনো পাইনি। শুধু দেখলাম তিনি একজন ফাইনান্সিয়াল অ্যানালিস্ট এবং গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। তাতে আমি দোষের কিছু দেখি না। তিনি যদি সত্যিই বাংলাদেশ ব্যাংককে গতিশীল এবং ইফেকটিভ করতে পারেন তাহলে বাহবা পাবেন। আর আমি তো মনে করি আমলা বা বিদেশে পিএইচডি ডিগ্রিধারী হলেই যে তিনি সবকিছু ঠিক করে ফেলবেন এটা এখন আর বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। এই তথাকথিত ডিগ্রিধারীদের কার্যকলাপ আমরা দেখেছি।