মঙ্গলবার   ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   ফাল্গুন ১১ ১৪৩২   ০৭ রমজান ১৪৪৭

মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত করতে নতুন জোট আনার ষড়যন্ত্র নেতানিয়াহুর!

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:০৮ এএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে ‘হেক্সাগন’ (ষড়ভুজ) আকৃতির এক নতুন আঞ্চলিক জোটের পরিকল্পনা পেশ করেছেন। 

গত রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা জানান, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যকে উগ্র সুন্নি ও শিয়া অক্ষের বিপরীতে বিভক্ত করার একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। নেতানিয়াহুর মতে, এই জোটের মূল লক্ষ্য হবে ইসরায়েল, ভারত, গ্রিস এবং সাইপ্রাসের মতো দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত বলয় তৈরি করা। তিনি দাবি করেছেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ওই অঞ্চলের তথাকথিত চরমপন্থি শক্তিগুলোকে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে, যারা ইসরায়েল ও পশ্চিমা স্বার্থের পরিপন্থী।

তবে এই ঘোষণা আসার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের মধ্যে ব্যাপক সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ, এখন পর্যন্ত কোনো দেশই এই জোটে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। বিশেষ করে গ্রিস এবং সাইপ্রাসের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য হওয়ায় তাদের অবস্থান নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

উল্লেখ্য, গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসি ইতিপূর্বেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, যা এই দেশগুলোর জন্য আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ এই পরিকল্পনাকে একটি ‘ব্র্যান্ডিং এক্সারসাইজ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, এটি কোনো প্রকৃত সামরিক জোট নয় বরং বিদ্যমান কিছু বিচ্ছিন্ন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বড় করে দেখানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র।

নেতানিয়াহু বর্তমানে ইরান সমর্থিত প্রতিরোধ অক্ষ বা শিয়া জোটের বিরুদ্ধে তার কথিত সামরিক সাফল্যকে পুঁজি করে এই নতুন জোটের প্রচারণা চালাচ্ছেন। তেহরানের মদতপুষ্ট হিজবুল্লাহ, হুথি এবং ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব কমানোর দাবি করে তিনি এখন সুন্নি প্রধান দেশগুলোর মধ্যেও ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী একটি ‘উগ্র সুন্নি অক্ষ’ তৈরি হচ্ছে, যদিও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি প্রধান দেশগুলো কোনো আদর্শিক কারণে নয়, বরং ইসরায়েলের আঞ্চলিক আগ্রাসন এবং গাজায় চলমান গণহত্যার প্রতিবাদে কূটনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। তুরস্ক, সৌদি আরব এবং মিশরের মতো দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বিরোধ মিটিয়ে এখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে।

ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গভীর হলেও নয়াদিল্লি এই জোটে সরাসরি নাম লেখাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার কথা বলছেন, তবে ভারত ঐতিহাসিকভাবেই কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকের অন্তর্ভুক্ত হওয়া এড়িয়ে চলে। ভারতের বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো এবং ইরানের সঙ্গে জড়িত, তাই নেতানিয়াহুর এই ‘অক্ষ বনাম অক্ষ’ লড়াইয়ে ভারত নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত প্রথাগতভাবে বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এবং তারা কোনোভাবেই ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের ‘সভ্যতাগত’ সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইবে না।

অন্যদিকে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রিস এবং সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরায়েলের জ্বালানি ও নিরাপত্তা বিষয়ক কিছু চুক্তি থাকলেও তা পূর্ণাঙ্গ কোনো জোটের রূপ পায়নি। যদিও গ্রিস ইসরায়েল থেকে বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনছে, তবুও তারা তুরস্কের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে নতুন করে কূটনৈতিক সংলাপ শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গের মতে, ইসরায়েলের বর্তমান আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এতটাই ক্ষুণ্ণ হয়েছে যে, কোনো রাষ্ট্রই এখন তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক জোটে জড়াতে আগ্রহী নয়। তার মতে, ইসরায়েল বর্তমানে একটি অস্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো যুদ্ধের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

নেতানিয়াহুর ষড়ভুজ জোটের ধারণাটি আসলে এমন এক সময়ে এল যখন তিনি নিজ দেশে এবং বিদেশে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছেন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিচার বিভাগীয় সংস্কার নিয়ে গণবিক্ষোভ এবং কট্টরপন্থি ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ সংক্রান্ত বিবাদ তাকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাগুলো তাকে জেলের দোরগোড়ায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। এমতাবস্থায় আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেকে একজন বিশ্বনেতা এবং অপরাজেয় কৌশলী হিসেবে প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। এই জোটের প্রচারণা মূলত তার দেশীয় ভোটারদের আশ্বস্ত করার একটি হাতিয়ার, যাতে তারা মনে করে যে ইসরায়েল বিশ্বে একা হয়ে পড়েনি।

অর্থনৈতিকভাবেও ইসরায়েল এখন এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো দেশটির অর্থনীতির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক যুদ্ধ এবং বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলি হামলার ফলে দেশটির সামরিক ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে একটি কাল্পনিক জোটের স্বপ্ন দেখিয়ে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করাই নেতানিয়াহুর মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করেন অনেক সমালোচক। তারা একে ‘ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড’ (কল্পনার জগত) হিসেবে বর্ণনা করছেন, যা বাস্তবের কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নেতানিয়াহুর এই প্রস্তাবিত জোট মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনীতিতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে বলে মনে হয় না। বরং তার এই সাম্প্রদায়িক এবং বিভাজনমূলক বক্তব্য এই অঞ্চলে মেরুকরণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, যা শান্তি প্রক্রিয়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের একাকীত্ব ঘুচানোর জন্য যে ধরণের নৈতিক ও আইনি গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন, তা এই মূহুর্তে নেতানিয়াহুর সরকারের কাছে নেই। ফলে এই ‘হেক্সাগন’ পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল কাগজের একটি নকশা হিসেবেই থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, যা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক সমর্থন জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব।

সূত্র: আল জাজিরা