বৃহস্পতিবার   ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২৯ ১৪৩২   ২৪ শা'বান ১৪৪৭

রাজধানী ছেড়েছেন প্রায় এক কোটি মানুষ

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৮:৩১ এএম, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার

সাধারণত ঈদের ছুটি ছাড়া ঢাকার রাজপথ ফাঁকা থাকার নজির খুব একটা নেই। এবার সংসদ নির্বাচন ঘিরে ঈদের ছুটিও যেন হার মেনেছে। টানা চার দিনের ছুটি পেয়ে রাজধানী ছেড়েছে প্রায় এক কোটি মানুষ। ঈদে যান চলাচলে বিধিনিষেধ না থাকলেও সংসদের ভোট ঘিরে রয়েছে নানা নিষেধাজ্ঞা। ফলে কেউ চাইলেই রাজপথে সাবলীল চলাচল করতে পারছেন না। মেট্রোরেল চললেও সেখানে যাত্রী সমাগম কম। তবে গতকাল বুধবারও ট্রেন, লঞ্চ ও বাস টার্মিনালে ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

সরকারি ছুটি চলবে আগামী শনিবার পর্যন্ত। এ সময় দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টানা ছুটি পেয়ে আগেভাগেই ঢাকা ছাড়তে শুরু করেন। ফলে গত কয়েক দিন বাস, লঞ্চ ও রেলস্টেশনে ছিল উপচে পড়া ভিড়।

এদিকে রাজপথে গণপরিবহন না থাকায় অনেককে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। দূরপাল্লার কিছু পরিবহন চললেও সিটি সার্ভিসের কোনো বাস চলতে দেখা যায়নি। এমনকি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও চলেছে খুব কম। শেয়ার রাইডগুলোও বন্ধ। ফলে যারা শহরের মধ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বেরিয়েছেন, তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। এই সুযোগে সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকরা বাড়তি ভাড়া আদায় করেছেন। 

কাফরুলের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেন বলেন, আগারগাঁও পিএসসির সামনে প্রতিদিন সকালে বাজার বসে। বুধবার গিয়ে দেখি দুয়েকটি দোকান ছাড়া তেমন কোনো ক্রেতা-বিক্রেতা নেই। এত ফাঁকা শহর সম্প্রতি দেখেছি বলে মনে হয় না। তিনি বলেন, টানা ছুটির কারণে অনেকেই ঢাকার বাইরে চলে গেছেন। এ ছাড়া ভোট তো আছেই। 
গণমাধ্যমকর্মী তাসনিম মহসিন জানান, তিনি বাইকে চলাফেরা করেন। অন্য সময় যে পথ পাড়ি দিতে এক ঘণ্টা লাগে, গতকাল সেটা লেগেছে ১৫ মিনিটের মতো। ঈদের ছুটির সময়ও এত ফাঁকা রাস্তা তিনি দেখেননি। 

কোথাও নেই যানজট
গতকাল রাজধানীর কোথাও যানজট দেখা যায়নি। ট্রাফিক সিগন্যালগুলো ছিল ফাঁকা। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদেরও কোনো তৎপরতা ছিল না। মাঝে মাঝে দুয়েকটি অটোরিকশা ও জরুরি সেবার গাড়ি চলতে দেখা গেছে। তবে কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘরমুখী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল লক্ষণীয়।

ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, এই নির্বাচন নিয়ে মানুষের উৎসাহ যেমন আছে, আতঙ্কও আছে। এ জন্য অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছেন না। 
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পরিবহন শ্রমিকরা ভোট দিতে গ্রামের বাড়িতে গেছেন। এ জন্য রাস্তায় যানবাহনের চাপ নেই।

সরেজমিন যে দৃশ্য দেখা গেল 
১৭ বছর পর কোনো বাধা ছাড়াই ভোটাধিকার প্রয়োগের আশায় ঢাকা ছেড়েছেন কোটি মানুষ। গতকাল বুধবারও রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড এবং সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল দিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ট্রেন, বাস ও লঞ্চ ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। নির্বাচন ঘিরে ঘরমুখী মানুষের এমন দৃশ্য নজিরবিহীন। 
গতকাল বুধবার সরেজমিন কমলাপুর রেলস্টেশনে দেখা যায়, বাসের টিকিট না পাওয়ায়, কিংবা অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অধিকাংশ যাত্রী ট্রেনযাত্রাকে বেছে নিয়েছেন। তবে ট্রেনে আসন সংকট প্রকট। অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে, কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে উঠে গন্তব্যে রওনা হন। গতকাল আগেভাগেই স্টেশন আর টার্মিনালে এসে অনেকে টিকিট পাননি। 
জামালপুরের সরিষাবাড়ীর বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মঙ্গলবার পরিবারসহ রেলস্টেশনে এসে ট্রেনের টিকিট পাইনি। তাই বুধবার ভোরে চলে আসি। তবে আজও টিকিট নেই। ২০১৪-এর নির্বাচনে ভোটার হলেও গত তিন নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি। তাই কষ্ট হলেও যেতে হবে।’ একই কথা বলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের মফিজুল ইসলাম। সমকালকে তিনি বলেন, ট্রেনের টিকিট পাননি। তবুও স্টেশনে গেছেন। 

কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সাজেদুল ইসলাম গতকাল জানান, গত দুই দিন যাত্রীর চাপ ছিল অনেক বেশি। দুপুরে একটু চাপ কমেছে।
মাগুরায় ভোট দিতে যাচ্ছেন আরিফা ও তাঁর স্বামী। আরিফা বলেন, দীর্ঘদিন পর এমন উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হচ্ছে। এবার প্রথমবার ভোট দেব। এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। 
খুলনার ভোটার বীথিকা মজুমদার। স্বামীসহ ফার্মেগেটে থাকেন। গতকাল ছুটি হলেও তিনি যেতে পারেননি। আজ সকালে এসে প্রথমে টিকিট পাননি। তবে বাস আসতে দেরি করেছে।
গতকাল বিকেলে সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালে দেখা যায়, সকাল থেকেই চাঁদপুরের উদ্দেশে যাত্রী বোঝায় নিয়ে লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে। লালকুঠি ঘাটের চায়ের দোকানদার মামুন বলেন, সোম ও মঙ্গলবার টার্মিনালে দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না। পটুয়াখালী বাউফলের রফিকুল ইসলাম স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রওনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভোটার হওয়ার পর এবারই প্রথম ভোট দিতে পারব। স্ত্রীও এবার ভোটার হয়েছে। সায়েদাবাদ গিয়ে টিকিট পাননি। তাই লঞ্চেই ভরসা। কেবিন না পেয়ে ডেস্কেই চলে যাবেন।