বৃহস্পতিবার   ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২৯ ১৪৩২   ২৪ শা'বান ১৪৪৭

রাত পোহালে ভোট

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১১:১০ পিএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বুধবার

গণতন্ত্রে ফেরার দীর্ঘ অপেক্ষার পালা অবশেষে ফুরাচ্ছে। আজকের রাত পোহালেই সারাদেশে শুরু হবে ভোট উৎসব। গত তিনটি জাতীয় নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তাই দীর্ঘ দেড় যুগ পর পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে উদগ্রীব হয়ে আছেন ভোটাররাও। পুরো দেশ এখন উৎসবমুখর। ভোটাররা যে যেভাবে পারছেন ঢাকা ছেড়ে নিজ নিজ সংসদীয় আসনে ছুটছেন। সড়ক, নৌ, বিমান প্রতিটি পথেই গতকাল ছিল উপচেপড়া ভিড়। গ্রামে গ্রামে চলছে ভোটের আড্ডা, চায়ের কাপে বইছে তুফান। ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ইতোমধ্যেই ২৯৯টি আসনে ভোট ও গণভোটের ব্যালট পৌঁছে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শেরপুর-৩ আসনে ভোট স্থগিত করা হয়েছে ওই আসনে জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুতে। পোলিং সেন্টারে আজ বুধবার থেকে ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ শুরু হবে, সন্ধ্যা নাগাদ তা চলে যাবে কেন্দ্রে কেন্দ্রে। প্রস্তুত ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোট কক্ষ। কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলবে ভোটগ্রহণ।

এবারের নির্বাচনে ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে ইসি। শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে এবার সারাদেশের ভোটকেন্দ্রগুলো পর্যবেক্ষণে ড্রোন, বডি ওর্ন ক্যামেরা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ৯০ শতাংশেরও বেশি কেন্দ্রে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা।

এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র ২৪৯ জনসহ মোট প্রার্থী এক হাজার ৯৭৬ জন। তাদের মধ্যে শেষ হাসি হাসবেন ২৯৯ জন। প্রতি আসনে গড়ে ৬ দশমিক ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ধানের শীষ প্রতীকে ২৯০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বিএনপি। অন্যগুলো তাদের জোট শরিক দলের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতায় জামায়াত ২২৩টি আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে লড়ছে। দলটি তার মিত্রদের জন্য ৭৬টি আসন ছেড়ে দিয়েছে। ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে লড়াই করছে ৩২টি আসনে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির (জেপি) লাঙ্গল প্রতীক রয়েছে ১৯২টি আসনে। দলগতভাবে হাতপাখা নিয়ে ২৫৯টি আসনে লড়ছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন। এবার তরুণ ভোটার মোট ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৬ জন, যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে তরুণদের ভোট। তাদের রায় যেদিকে যাবে, ভোটের ফল সেদিকেই ঝুঁকবে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে অনুষ্ঠিত গত তিনটি সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। এর মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশ-প্রশাসনের সহায়তায়। এ জন্য একে বলা হয় ‘রাতের ভোট’। দ্বাদশ নির্বাচনে অধিকাংশ দলই অংশ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতারাই প্রতিপক্ষ সেজে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। এ জন্য একে বলা হয়ে থাকে ‘ডামি ভোট’। এই তিনটি নির্বাচনই দেশি-বিদেশি মহলে মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং গ্রহণযোগ্যতা হারায়। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন মানুষ নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; আশ্রয় নেন ভারতে। একই বছর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকার ক্ষমতায় এসে এক নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। নির্বাচন কমিশনও দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। তাই এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়নি আওয়ামী লীগ। দলটির বিপুলসংখ্যক ভোটার-সমর্থক শেষ মুহূর্তে ভোট দেবে কিনা, এ নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা।

সব মিলিয়ে এক পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে চলবে। তাই দেশের প্রতিটি মানুষের চোখ এই নির্বাচনের দিকে। দেশের পাশাপাশি বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টিও এখন বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে। তাই এবারের নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন খুবই সতর্ক। সরকার চাইছে একটি সুন্দর নির্বাচন দিয়ে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে।

এবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে মাঠে রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য ১ লাখ, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনী ৩ হাজার ৭৩০ (স্থলভাগÑ ১ হাজার ২৫০), বাংলাদেশ পুলিশের ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, র‌্যাবের ৭ হাজার ৭০০, সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৩ হাজার ৩৯০।

ঐতিহাসিক এ নির্বাচন দেখতে ১৯টি দেশ থেকে ৫৪০ জন সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে আসছেন। এর সঙ্গে রয়েছেন দেশি ৫৫ হাজার পর্যবেক্ষক।

এবারের নির্বাচনে প্রথম প্রবাসী বাঙালি ভোটার এবং দেশের অভ্যন্তরে থাকা সরকারি চাকরিজীবী, কারাবন্দি ও যারা ভোটকেন্দ্রে যেতে অক্ষম এবং ভোটে নিয়োজিত কর্মকর্তারা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে দেশে ও দেশের বাইরে থেকে আসা ৭ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি পোস্টাল ব্যালট ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।