ইসরাইলি বোমায় বাষ্পে পরিণত হচ্ছে ফিলিস্তিনিরা
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৮:৩৮ এএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বুধবার
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন যুদ্ধাপরাধের চূড়ান্ত সীমা লঙ্ঘন করেছে অনেক আগেই।এবার আরো ভয়ঙ্কর তথ্য মিলেছে আলজাজিরার অনুসন্ধানে, যা শরীর হিম করে দিতে পারে যেকারো।
সেখানে এমন সব বোমা ফেলছে ইহুদিবাদী দখলদাররা যাতে তাৎক্ষণিক সাড়ে তিন হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা উৎপাদন হচ্ছে এবং চোখের পলকে বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাশে মিশে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের দেহ।
২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ভোরে গাজা শহরের আল-তাবিন স্কুলে বোমা হামলা করে ইসরাইলি সেনারা। প্রচণ্ড ধোঁয়া আচ্ছন্ন ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে ছেলে সাদের সন্ধানে হাঁটছিলেন ইয়াসমিন মাহানি। তিনি তার স্বামীকে চিৎকার করতে দেখেন, কিন্তু সাদের কোনো চিহ্ন ছিল না।
মাহানি বলেন, ‘আমি মসজিদের ভেতরে গেলাম এবং নিজেকে রক্ত ও মাংসের ওপর পা রাখতে দেখলাম।’
তিনি দিনের পর দিন হাসপাতাল ও মর্গে খুঁজেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সাদের কিছুই পাইনি। এমনকি দাফন করার জন্য লাশের একটি টুকরাও মেলেনি। সেটাই ছিল সবচেয়ে কষ্টের বিষয়।’
হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মধ্যে মাহানি একজন, যাদের প্রিয়জনরা গাজায় ইসরাইলের এই আগ্রাসনে স্রেফ অদৃশ্য হয়ে গেছে। এই আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত ৭২ সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়েছে।
আলজাজিরা অ্যারাবিকের তদন্তমূলক প্রতিবেদন ‘দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি’ অনুসারে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে গাজার সিভিল ডিফেন্স টিম ২ হাজার ৮৪২ ফিলিস্তিনিকে নথিভুক্ত করেছে যারা ‘বাষ্পীভূত’ বা মিলিয়ে গেছে। তাদের রক্ত বা মাংসের ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কোনো অবশিষ্টাংশ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এসব ঘটনার জন্য ইসরাইলের পদ্ধতিগতভাবে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ তাপীয় এবং থার্মোবারিক অস্ত্রের (যাকে প্রায়ই ভ্যাকুয়াম বা অ্যারোসল বোমা বলা হয়) ব্যবহারকে দায়ী করেছেন। অস্ত্রগুলো ৩ হাজার ৫০০ ডি. সে. পর্যন্ত তাপমাত্রা তৈরি করতে সক্ষম।
ভয়াবহ ফরেনসিক হিসাব
২ হাজার ৮৪২ সংখ্যাটি কোনো সাধারণ অনুমান নয়, বরং গাজার সিভিল ডিফেন্সের একটি ভয়াবহ ফরেনসিক হিসাবের ফল। সংস্থাটির মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, ‘আমরা একটি লক্ষ্যবস্তু করা বাড়িতে প্রবেশ করি এবং সেই বাড়িতে থাকা পরিচিত সদস্য সংখ্যার সঙ্গে উদ্ধার করা মরদেহের সংখ্যা মিলিয়ে দেখি।’
তিনি আরো বলেন, ‘যদি একটি পরিবার আমাদের বলে যে ভেতরে পাঁচজন লোক ছিল এবং আমরা কেবল তিনটি অক্ষত দেহ উদ্ধার করি, তবে বিশেষ তল্লাশির পর যদি রক্তের ছিটে বা মাথার চামড়ার মতো জৈবিক চিহ্ন ছাড়া আর কিছু না পাওয়া যায়, তখন আমরা বাকি দুজনকে ‘বাষ্পীভূত’ হিসেবে গণ্য করি‘।
মুছে ফেলার রসায়ন
তদন্তে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, কীভাবে ইসরাইলি মারণাস্ত্রের নির্দিষ্ট রাসায়নিক সংমিশ্রণ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মানুষের শরীরকে ছাইয়ে পরিণত করে।
রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ ভাসিলি ফাতিগারভ বলেন, থার্মোবারিক অস্ত্র কেবল হত্যাই করে না, বরং পদার্থকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। সাধারণ বিস্ফোরকের বিপরীতে, এ অস্ত্র একটি জ্বালানি মেঘ ছড়িয়ে দেয়, যা প্রজ্বলিত হয়ে একটি বিশাল অগ্নিগোলক এবং ভেকুয়াম বা শূন্যতা তৈরি করে।
ফাতিগারভ বলেন, ‘জ্বলন্ত সময় দীর্ঘায়িত করার জন্য রাসায়নিক মিশ্রণে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং টাইটানিয়ামের গুঁড়ো যোগ করা হয়। এটি বিস্ফোরণের তাপমাত্রা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বাড়িয়ে দেয়।’
তদন্ত অনুযায়ী, এই তীব্র তাপ প্রায়ই ট্রাইটোনাল দ্বারা উৎপন্ন হয়, যা টিএনটি এবং অ্যালুমিনিয়াম পাউডারের মিশ্রণ। এটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এমকে-৮৪-এর মত বোমাগুলোতে ব্যবহার করা হয়।
গাজার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. মুনির আল-বুরশ মানুষের শরীরের ওপর এমন চরম তাপের প্রভাব ব্যাখ্যা করেছেন। মানুষের শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশই পানি। তিনি বলেন, ‘পানির স্ফুটনাঙ্ক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যখন একটি দেহ ৩ হাজার ডিগ্রির বেশি শক্তির পাশাপাশি প্রচণ্ড চাপ এবং অক্সিডেশনের সংস্পর্শে আসে, তখন তরলগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ফুটতে শুরু করে। টিস্যুগুলো বাষ্পীভূত হয়ে ছাইয়ে পরিণত হয়। এটি রাসায়নিকভাবেই অনিবার্য।’
