বুধবার   ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২৯ ১৪৩২   ২৩ শা'বান ১৪৪৭

৪২ হাজার কোটি টাকার কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৮:২৯ এএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বুধবার

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। সোমবার স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিতে যা উল্লেখ রয়েছে। এসব কৃষিপণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে)। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য। আর আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য।

কৃষিপণ্যের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে—আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি। পাশাপাশি এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) মূল্যের সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য। এছাড়া তুলা আমদানির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন উড়োজাহাজ, জ্বালানি এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে সম্মত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির তৈরি ১৪টি বেসামরিক উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত উড়োজাহাজ ক্রয়ের বিকল্পও রাখা হয়েছে। এছাড়া উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও সংশ্লিষ্ট সেবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহের বিষয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা চুক্তিতে বলা হয়েছে। চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে, জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ (এলএনজি) বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য দীর্ঘমেয়াদে আমদানির উদ্যোগ নেবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিসহ ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর বিষয়ে প্রচেষ্টা চালাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরিমাণ সীমিত রাখার কথাও চুক্তিতে বলা হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দেবে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের এসব পণ্যের মধ্যে আছে রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিত্সা যন্ত্রপাতি, যন্ত্র, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি, সয়াজাত ও দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি, বাদাম ও বিভিন্ন ফল।

এই চুক্তির আওতায় থাকা বিভিন্ন শ্রেণির পণ্যের তালিকা প্রকাশ করেছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর)। যেখানে দেড় হাজারের বেশি পণ্য আছে, যেগুলো বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে শুল্কমুক্ত সুবিধায়। যুক্তরাষ্ট্র এই পণ্যগুলোর ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে। পণ্যগুলোকে ‘এন্ট্রি ইনটু ফোর্স’ বা ইআইএফ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে গবাদি পশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য শিল্পজাত পণ্য।

উল্লেখ্য, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে উত্পন্ন পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। যৌথ ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানি করা হলে তাতে পালটা শুল্ক আরোপ হবে না এমন ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে দেশটি। তবে পরিমাণ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কতটা সুতা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করা হচ্ছে, তার ওপর।

চুক্তি সই হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ২০১৩ সালে সই হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম অ্যাগ্রিমেন্টের (টিকফা) ধারাবাহিকতায় এ চুক্তি হয়েছে। হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে এই বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।

চুক্তিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিদ্যমান অশুল্ক বাধা কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল মোটরযান নিরাপত্তা ও নির্গমন মানদণ্ড অনুযায়ী নির্মিত যানবাহন গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে চিকিত্সা যন্ত্রপাতি ও ওষুধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) দেওয়া সনদের স্বীকৃতি দেবে। যেসব ওষুধ এফডিএ আগেই বাজারজাতকরণের অনুমোদন দিয়েছে, সেই অনুমোদনেও স্বীকৃতি দেবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্নির্িমত (রিম্যানুফ্যাকচার্ড) পণ্য ও যন্ত্রাংশের ওপর বিদ্যমান যে কোনো আমদানি নিষেধাজ্ঞা বা লাইসেন্সের শর্ত তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ।

ডিজিটাল বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সংস্কারেও উল্লেখযোগ্য অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বস্ত দেশের সঙ্গে মধ্যে তথ্যের অবাধ আদান-প্র্রদানের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) মার্কিন উদ্যোগে সমর্থন দেবে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকিনির্ভর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। এ ছাড়া বিমা খাতে বিদ্যমান বাধা দূর করা, শুল্ক প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ক্ষেত্রে উত্কৃষ্ট রীতিনীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে আছে জোরপূর্বক বা বাধ্যতামূলক শ্রমে উত্পাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা ও তা কার্যকর করা, শ্রমিকদের সংগঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে যৌথ দর-কষাকষির অধিকার পূর্ণাঙ্গরূপে নিশ্চিত করতে শ্রম আইন সংশোধন ও শ্রম আইনের কঠোর প্রয়োগ করবে বাংলাদেশ। পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশ কঠোর মানদণ্ড বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছে। সেই সঙ্গে পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের কথাও বলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে বাংলাদেশ শুল্ক ও বাণিজ্যব্যবস্থা সহজীকরণ এবং ভর্তুকি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কারণে বাজারব্যবস্থায় যে বিকৃতি ঘটে, সেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর অঙ্গীকার করেছে।

মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ কঠোর মানদণ্ড গ্রহণে সম্মত হয়েছে। এর আওতায় নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব চুক্তি অনুমোদন বা তাতে যোগদান এবং সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে, যৌথ বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী আইন জোরদার ও প্রয়োগের অঙ্গীকার করেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ও যোগ্যতা সাপেক্ষে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস (এক্সিম ব্যাংক) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনসহ (ডিএফসি) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে। দুই দেশ জানিয়েছে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে : বাণিজ্য উপদেষ্টা

এদিকে গতকাল সচিবালয়ে মার্কিন শুল্ক চুক্তি নিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করি, সেই তুলা দ্বারা প্রস্তুতকৃত যে গার্মেন্টস আছে, সেই গার্মেন্টস যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য সম্পূরক শুল্কে প্রবেশাধিকার পাবে। সহজভাবে বললে আমাদের ৮৫ বা ৮৬ শতাংশ রপ্তানির ওপরে শুল্ক শূন্য এবং ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ রপ্তানির ওপরে সম্পূরক শুল্ক হবে ১৯ শতাংশ।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, আমাদের ১ লাখ কোটি টাকার ওপরে রপ্তানি হয় আমেরিকার বাজারে। আমাদের জন্য এই বাজারটা অতি সংবেদনশীল এবং অতি প্রয়োজনীয় একটা বাজার। এই বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা সামগ্রিকভাবে একান্ত প্রচেষ্টায় প্রথম ধাপে ৩৭ শতাংশ থেকে শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশে নিয়ে আসতে সমর্থ হই। এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এই চুক্তির মধ্যে আমাদের এই শর্ত যুক্ত আছে যে, যদি প্রয়োজন হয়, আমরা একটা অ্যাপ্রোপ্রিয়েট নোটিশ দিয়ে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারব।

সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা যে চুক্তিটা স্বাক্ষর করেছি, তার সাথে তারা ‘পটেনশিয়াল ট্যারিফ অ্যাডজাস্টমেন্ট ফর পার্টনার কান্ট্রিস’ নামে একটা ট্যারিফ সুবিধা দিয়েছে। চুক্তিটা কার্যকর হওয়ার দিন থেকে সেটা কার্যকর হবে। সেটা হলো ২ হাজার ৫০০ আইটেমের ওপরে তারা ডিউটি ফ্রি বেনিফিট দিয়েছে। তার মধ্যে আমরা যা উত্পাদন করি, মোটামুটি ফার্মাসিউটিক্যালস হলো ১ নম্বর। ফার্মাসিউটিক্যালসের সবগুলো এইচএস কোড, সবগুলো র-ম্যাটেরিয়ালের ওপরে ডিউটি ফ্রি বেনিফিট দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্লাস্টিক পণ্য, উড়োজাহাজের যন্ত্রপাতি, প্লাইউড বোর্ডসহ অনেক পণ্য রয়েছে। যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তিতে গেছে, তাদের জন্য এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান সচিব।