রোববার   ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ১৯ ১৪৩২   ১৩ শা'বান ১৪৪৭

তৈরি পোশাকশিল্পে বিপদ সংকেত

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৮:২৯ এএম, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রোববার

ভারত-ইইউ এফটিএ চুক্তি
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া হচ্ছে। কেননা এ চুক্তির অধীনে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশ ভারতের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পণ্যের শুল্ক তুলে নেবে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, চামড়া, পাদুকা, সামুদ্রিক পণ্য, রত্ন ও অলংকার এবং রাসায়নিক পণ্য রয়েছে। অন্যদিকে নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চাপ তো আছেই। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। এছাড়া রপ্তানি তালিকায় সমজাতীয় পণ্যে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে বাংলাদেশ। রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদের অনেকে বলছেন, বিষয়টিকে বিপদ সংকেত হিসাবে বিবেচনায় নিয়ে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। 

প্রায় দুই দশক ধরে আলোচনার পর গত ২৭ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে নয়াদিল্লিতে এই চুক্তির ঘোষণা করা হয়। দুই দেশের শীর্ষ নেতা এটিকে ‘মাদার অব অল ডিলস’ (সব চুক্তির সেরা) হিসাবে অভিহিত করেন। বর্তমানে চুক্তিটি ‘লিগ্যাল স্ক্রাবিং’ বা আইনি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত স্বাক্ষরের পর এটি কার্যকর হতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের মধ্যে এটি পুরোপুরি কার্যকর হবে। 

এ বিষয়ে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক যুগান্তরকে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের এফটিএ চুক্তির প্রভাব অনেক সদূরপ্রসারী। এ চুক্তি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে। কেননা ভারত তখন ইইউভুক্ত দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, যেটা এখন বাংলাদেশ পাচ্ছে। যদি বাংলাদেশ ইউরোপে বাজার সুবিধা ধরে রাখতেও পারে তারপরও ভারতের সঙ্গে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। কারণ ভারত নিজস্ব তুলা, সুতা থেকে মেশিন ও মেশিনের যন্ত্রাংশ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেখানে বাংলাদেশকে সবই আমদানি করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ ৩ বছরের ট্রানজিশন সময় পাবে। অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাসের অধীনে শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশাধিকার সুবিধা পাওয়ার তৎপরতা চালাতে হবে, তা না হলে সামনে বিপদ অপেক্ষা করছে। কারণ এফটিএ’র অধীনে ২০২৭ সাল থেকে ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। একদিকে ভারত ও অন্যদিকে ভিয়েতনাম ইউরোপে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে বাংলাদেশ তখন প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কেন এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা শুরু করছে না, তা বোধগম্য নয়।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসাবে ইউরোপে ইবিএ (অস্ত্র ছাড়া সব পণ্য) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায়। অন্যদিকে ইউরোপে ভারতীয় পোশাকের ওপর ৯-১২ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এফটিএ কার্যকর হলে এই শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে। 

রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারত ও ইইউর চুক্তির প্রভাব প্রশমনে বাংলাদেশকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কারণ এ চুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে। ওই চুক্তির মাধ্যমে ভারত পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বর্তমানে ভারত তুলা, সুতা ও কাপড় উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ চুক্তি কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারে ভারতের প্রতিযোগী সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশকে তুলা, মেশিন ও মেশিনের যন্ত্রাংশসহ সবই আমদানি করতে হয়। তার ওপর নানা কারণে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প রুগ্ণ হয়ে পড়ছে। ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সংকুচিত হওয়ায় তুলা আমদানি কমতে শুরু করেছে। এভাবে চলতে থাকলে তৈরি পোশাকের মূল্য সংযোজন কমবে, যা দীর্ঘমেয়াদি বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা সংকুচিত করবে। অন্যদিকে নভেম্বরে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস সুবিধা পেলেও তার অধীনে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। 

ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে রপ্তানি করেছে এক হাজার ৭৪৪ কোটি ইউরো। এ সময় ভারত রপ্তানি করেছে ৪০৯ কোটি ইউরো। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ রপ্তানি করে এক হাজার ৮৩১ কোটি ইউরো, ভারত রপ্তানি করে ৪১৮ কোটি ইউরো। ২০২৫ সালের ১১ মাসে (জানুয়ারি-নভেম্বর) বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে এক হাজার ৮০৫ কোটি ইউরো, পক্ষান্তরে ভারত রপ্তানি করেছে ৪২৪ কোটি ইউরো। 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তার মধ্যে ২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ইইউর বাজারে, যা বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশ। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ৮ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন, কানাডায় ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ও জাপানে ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। 

বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ অবস্থান কী হবে তা নিয়ে সরকারের কোনো রূপরেখা আছে বলে মনে হয় না। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ যদি এফটিএ বা জিএসপি প্লাসের অধীনে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে ২০২৯ সালের পর ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে। অন্যদিকে ভারত ও ভিয়েতনাম এফটিএ’র অধীনে শূন্য শুল্ক সুবিধা ভোগ করতে থাকবে। তখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ধস কেউ ঠেকাতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, গত ২০ বছর পর সাধনার পর ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ করতে পেরেছে। অথচ আগামী ৩ বছর পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ যে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে তা পুনর্বহালের জন্য আলোচনাই শুরু করতে পারেনি। আলোচনার জন্য প্রস্তুতি আছে বলেও মনে হয় না।

শামীম এহসান বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের হয়ে নেগোসিয়েশন করবে, এমন দক্ষ লোক নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ধর্ম বা কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতো অন্য মন্ত্রণালয় থেকে বদলি হয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নতুন যোগদান করেছেন বা ৩-৬ মাস কাজ করছেন, এমন সব অদক্ষ কর্মকর্তাকে এ ধরনের নেগোসিয়েশনে পাঠানো হয়। যাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান-ধারণা নেই। ফলে তারা নেগোসিয়েশনে ভূমিকা রাখতে পারে না। 

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পালটা শুল্ক আরোপ গোটা বিশ্বের বাণিজ্যব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। সব দেশ দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির দিকে ঝুঁকছে। কেবল নেগোসিয়েশন অদক্ষতার কারণে বাংলাদেশ সেখান থেকে পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের উচিত অতি দ্রুততার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নেগোসিয়েশনে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে টিম গঠন করার। প্রয়োজনে বিদেশিদের হায়ার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে স্পেশাল বিভাগও গঠন করা যেতে পারে। যেসব কর্মকর্তার কাজ হবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়া।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাংলাদেশ মোট রপ্তানির ৫০ ভাগ ইউরোপে করে থাকে। এ বাজারে হুমকি আমাদের জন্য সব সময় ক্ষতি বা ভয়ের কারণ। হয়তো রাতারাতি ইউরোপে ভারতের মার্কেট শেয়ার বাড়বে না। তবে এফটিএ বাস্তবায়ন হলে ভারতের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে পারে। কেননা ভারতের নিজস্ব তুলা আছে। এটা বাংলাদেশের চাইতে ভারতের সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেবে। অপরদিকে এলডিসির পর বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার হলে প্রতিযোগী সক্ষমতা আরও কমবে। তিনি আরও বলেন, ভারত চুক্তি করার পর এখন সবার টনক নড়েছে। এই চুক্তি তো ২০ বছরের আলোচনার ফসল। অথচ আমরা একটাও করতে পারছি না। এ নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কোনো রূপরেখাই নেই। এলডিসি উত্তরণ পেছানো বা এলডিসি উত্তরণ হলে কীভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখা যাবে-সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।