বৃহস্পতিবার   ১১ জুন ২০২৬   জ্যৈষ্ঠ ২৮ ১৪৩৩   ২৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

যারা বছরের পর বছর উধাও তারা মজলুমদের বলে গুপ্ত

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৮:২৩ এএম, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রোববার

জামায়াত আমির

  •     চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজদের গোড়া কেটে দিতে চাই
  •     মা-বোনেরা ১১ দলীয় জোটকে আস্থার ঠিকানা হিসেবে দেখছে
  •     ৫৪ বছর ধরে দেশে বেইনসাফি ও দুর্নীতির রাজনীতি চলছে

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বছরের পর বছর যারা নিজেরাই উধাও ছিল, তারাই এখন মজলুমদের ‘গুপ্ত’ ও ‘সুপ্ত’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ তোলার আগে সমালোচকদের আয়নায় নিজের চেহারা দেখা উচিত।

গতকাল শনিবার ঢাকা ও কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে ১১ দলীয় জোট আয়োজিত একাধিক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। এসব জনসভায় তিনি চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, জুলাই আন্দোলনের তাৎপর্য, গণভোট ও নির্বাচন, মা-বোনদের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বেইনসাফির সমালোচনা করেন।

কেরানীগঞ্জে ১১ দলীয় জোটের জনসভা : শনিবার বিকেলে ঢাকার কেরানীগঞ্জে ঢাকা জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দাঁড়িপাল্লা ও শাপলা কলির পক্ষে কাজ করতে গেলে যারা মা-বোনদের কাপড় খুলে দেওয়ার হুমকি দেয়, তারা মানুষ হতে পারে না। আল্লাহ না করুক, তারা যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে দেশের পরিবেশ কেমন হবে, তা চিন্তা করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ মহানগরী আমির আব্দুল জব্বার, দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মশিউল আলম, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ঢাকা-২০ আসনের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাশদিদ, ঢাকা-১৯ আসনের দিলশানা পারুল, ঢাকা-২ আসনের কর্নেল (অব.) আব্দুল হক, ঢাকা-৩ আসনের অধ্যক্ষ শাহীনুল ইসলাম, ঢাকা-১ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম প্রমুখ।

জামায়াতের আমির বলেন, মা ও বোনেরা এখন আর বিভ্রান্ত নয়, তারা ঐক্যবদ্ধ।
আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনের ফলই প্রমাণ করবে, কারা জনগণের আস্থার ঠিকানা। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতি কল্পনাও করেনি যে ফ্যাসিস্ট শক্তি অপদস্থ হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন হবে। তিনি অভিযোগ করেন, সাড়ে ১৫ বছর ধরে যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, তারাই ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ারবাজার লুট, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির মাধ্যমে দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, জুলাই স্মৃতিঘরে স্বৈরাচারের ‘আয়না ঘর’-এর নানা প্রোটোটাইপ সংরক্ষণ করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে যাঁরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন, তাঁদের সেখানে গিয়ে দেখে আসা উচিত মানুষের ওপর জুলুম করলে তার পরিণতি কী হয়।

তিনি বলেন, স্বৈরাচার সরকারের মন্ত্রীরা নিজেদের সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দেশের মানুষের রক্ত ও সম্পদ নিয়ে খেলা করেছে। তারা স্বার্থপর, মুনাফেক, তারা যা বলত তা করত না।

জুলাইকে স্বীকৃতি না দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা একটি দলের সমালোচনা করে আমিরে জামায়াত বলেন, ‘আমরা আশা কমরছিলাম, তারা জুলাইকে সম্মান করবে। কিন্তু শহীদ পরিবারের সদস্যদের অসম্মান করা হয়েছে।
জুলাইকে সম্মান করার মানে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, নিরীহ মানুষের জমি দখল ও মামলা বাণিজ্য, মায়ের গায়ে হাত দেওয়া হতে পারে না, এটি জুলাই চেতনার সঙ্গে যায় না।

তিনি আরো বলেন, জুলাই সনদ ও সংস্কারের জন্য গণভোট বিষয়ে তারা সামনে এগোতে দেয় না। পরে জনগণের ঠেলা পেয়ে গতকাল থেকে তারা গণভোটের বিষয়ে কথা বলা শুরু করেছে। ডা. শফিক বলেন, জুলাই না হলে ২০২৬ সালে কিসের নির্বাচন, জুলাই না হলে তো ফ্যাসিবাদের অধীনে ২৯ সালে নির্বাচন হতো। ২৬ সালে নির্বাচন চাইব আবার জুলাই মানব না, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না এটি হতে পারে না।

আমিরে জামায়াত অভিযোগ করে বলেন, যারা নিজেরা বছরের পর উধাও ছিল, তারাই আবার মজলুমদের বলে গুপ্ত আর সুপ্ত। সমালোচকদের আয়নায় নিজের চেহারা দেখার পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, “গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামী। আমরা আবরার ফাহাদ ও শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ চাই।”

চৌদ্দগ্রামে জনসভা : একই দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম পাইলট হাই স্কুল মাঠে ১১ দলীয় জোটের জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন বড় পরিবর্তন চায়। ১২ তারিখের পর যে পরিবর্তন আসবে, তা আসবে যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা, মায়েদের নিরাপত্তার দাবি এবং গোটা দেশের মর্যাদার ওপর ভর করে। তিনি বলেন, আগামীর বাংলাদেশে আর কোনো আধিপত্যবাদ, ফ্যাসিবাদ কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার মেনে নেওয়া হবে না। জামায়াতে ইসলামী কোনো দলীয় শাসন কায়েম করতে চায় না; বরং ১৮ কোটি মানুষের বিজয় নিশ্চিত করতে চায়।

জামায়াত আমির বলেন, যারা মানুষের সম্পদ, জীবন ও সম্মানে আঘাত করেছে, যারা মায়েদের ইজ্জতে হাত দিয়েছে, তাদের হাতে কি দেশের মায়েরা নিরাপদ থাকতে পারে, এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি।

যারা আজ চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিতে জড়িত, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারাও একসময় মজলুম ছিলেন, এখন কেন জালিম হলেন? এসব অপকর্ম ছেড়ে দিয়ে জাতিকে কষ্ট দেওয়া বন্ধ করুন।

সরকারি চাকরিজীবীদের কষ্টের কথা উল্লেখ করে ডা. শফিক বলেন, বর্তমান বেতনে অনেকেরই চলতে কষ্ট হয়। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে একটি জনকল্যাণমূলক সরকার গঠন করবে এবং মানুষের কল্যাণে যা যা প্রয়োজন, তাই করা হবে।

তিনি বলেন, কওমি অঙ্গনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব মামুনুল হক সাহেব আমাদের পাশে রয়েছেন। কওমি মাদরাসা বন্ধ করার প্রশ্নই আসে না, বরং এর উৎকর্ষ সাধনে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জনসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাসুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম প্রমুখ।

৫৪ বছর ধরে দেশে বেইনসাফি ও দুর্নীতির রাজনীতি চলছে : বুড়িচং উপজেলার নিমসার জুনাব আলী ডিগ্রি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, বেইনসাফি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মানুষ হত্যার মাধ্যমে গত ৫৪ বছর ধরে দেশে একটি পচা রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু রয়েছে। এই রাজনীতি আর দেখতে চায় না জনগণ। এই সংস্কৃতি পরিবর্তনের জন্যই জামায়াতে ইসলামী রাজপথে নেমেছে। তিনি বলেন, যুবসমাজ বুকের রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তাদের সেই আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে হবে।

বাংলাদেশে পচা রাজনীতি আর চলতে দেব না : দাউদকান্দি উপজেলার বিশ্বরোড এলাকায় অনুষ্ঠিত জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে পচা রাজনীতির বন্দোবস্ত আর চলতে দেওয়া হবে না। যারা ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ারবাজার লুট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে, তারা আর জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারবে না।

তিনি বলেন, মা ও বোনেরা স্পষ্ট করে জানাচ্ছেন—তাঁরা অনিরাপদ বাংলাদেশ চান না। তাঁরা নিরাপদ বাংলাদেশ চান। এ কারণেই মা-বোনেরা ১১ দলীয় জোটকে আস্থার ঠিকানা হিসেবে দেখছে।

আমিরে জামায়াত বলেন, মায়েরা খোলাখুলি বলেন তাঁরা অনিরাপদ বাংলাদেশ দেখতে চান না, তাঁরা একটি নিরাপত্তার বাংলাদেশ চান। আমরা বিশ্বাস করি, দাঁড়িপাল্লা ও তার সঙ্গীরাই দেশবাসীকে নিরাপত্তা দিতে পারবে।

তিনি বলেন, যে দেশে মাঠে, ঘাটে, পথে-প্রান্তরে সর্বত্র চাঁদাবাজি হয়, সেটি সভ্য দেশ হতে পারে না। চাঁদাবাজদের খাদ্যের অভাব হলে আমাদের খাদ্য ভাগাভাগি করে খাব। চাঁদাবাজি ছেড়ে দিতে হবে।