শনিবার   ৩১ জানুয়ারি ২০২৬   মাঘ ১৭ ১৪৩২   ১২ শা'বান ১৪৪৭

ভোটের উত্তাপে কাঁপছে বাংলাদেশ

মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:০৯ এএম, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ শনিবার

 

 

ভোটের উত্তাপে কাঁপছে বাংলাদেশ। প্রচারে সরগরম গোটা দেশ। প্রার্থীদের ঘুম নেই। গ্রাম-গঞ্জ থেকে নগর-মহানগর -- সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছেন। উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি আছে উৎকন্ঠাও। সহিংস ঘটনা জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনী সহিংসতায় শেরপুরে জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মি নিহত হওয়ার পর ভয়-ভীতিরও সৃষ্টি হয়েছে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা বৃদ্ধির আশঙ্কা চারদিকে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ সাধারন নির্বাচন এবং গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় আগ্রহটা একটু বেশিই। বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বে দু’টি পৃথক জোট এবারের নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্ধী। সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির নিরঙ্কুশ জয় লাভ করায় দলটি জাতীয় নির্বাচনেও মিরাকল আশা করছে। যদিও বিএনপি এই মূহুর্তে নানা সমীকরণে এগিয়ে আছে। কারণ জামায়াতে ইসলামী কোনও নারী প্রার্থী না দেওয়ায় নারী ভোট বিএনপি বেশি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া, এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে আওয়ামী লীগের ভোট। আওয়ামী লীগের ভোটাররা আদর্শগত অমিলের কারণে জামায়াতকে ভোট দেবার কথা নয়। ফলে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। যদিও এবার যে সব সমীকরণ পিছনে ফেলে নতুন বন্দোবস্ত গড়ে তোলার ভোট হচ্ছে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কার সাধনের লক্ষে এবারের নির্বাচনকে উপযুক্ত মনে করা হচ্ছে। কারণ এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে গণঅভ্যূূত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর। শেখ হাসিনার সরকার রীতিমত স্বৈরাচার হয়ে উঠেছিল। স্বৈরাচার সৃষ্টির পথ চিরতরে বন্ধ করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কার করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের কী কী সংস্কার হবে তা নির্ধারণের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জাতীয় সংস্কার কমিশনের বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠক পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অধ্যাপক আলী রিয়াজ। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টসহ সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের নানা সুপারিশ আলোচনায় উঠে আসলেও সকল দল সকল বিষয়ে একমত হয়নি। বিশেষ করে বড় দল বিএনপি অনেক বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।
সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে চারটি প্রশ্নের মধ্যে এনে তার প্রতি হ্যাঁ কিংবা না উত্তর দেবার বিধান দিয়ে গণভোট হচ্ছে। অর্ন্তবর্তি সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে নির্বাচিত সংসদ শপথ নেবার ১৮০ দিন পর্যন্ত সংসদ সদস্যরা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসাবে কাজ করবেন। তারা সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নির্ধারণ করে তা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে জাতীয় সংসদে পাস করালে সংবিধান সংশোধন হবে। এছাড়াও, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অর্ন্তবর্তি সরকার যেসব সংস্কার অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে পাস করাচ্ছেন; ওই সকল সংস্কার সংসদ গঠিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদে পাস না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী জাতীয় সংসদই নির্ধারণ করবে যে সংসদ সংস্কারের প্রশ্নে কতটা কী ভূমিকা পালন করবে। তবে গণভোটে ‘না’ জয়যুক্ত হলে কোনও সংস্কার হবে না।

অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার পর আর গণভোটের কোনও প্রয়োজনীয়তা ছিল না। একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে বলেও তাদের অভিমত। বরং জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুচারুভাবে পরিচালনা করে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন সম্ভব। তবে অর্ন্তবর্তি সরকারের প্রতিনিধিরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোই শেষ কথা নয়। জনগণের সম্মতিরও প্রয়োজন আছে। তাছাড়া, গণভোটে ‘হ্যা’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপরও একটা নৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে সংবিধান সংশোধনের জন্যে। গণভোটের একটা বড় ঝুঁকি হলো এতে ‘না’ জয়ী হলে সকল সংস্কার ভেস্তে যাবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতা-কর্মীরা না ভোট দিলে সংস্কার প্রস্তাব পাস করানো সম্ভব হবে না। যদিও বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবার পক্ষে তাদের দলের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে। তবে অজানা আশঙ্কায় রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরোটাই ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবার পক্ষে প্রচারে নেমেছে। সংস্কার প্রস্তাবগুলো এতটাই জটিল যে সাধারন মানুষের বোধগম্য হচ্ছে না। অনেকে এবারের গণভোটকে জিয়াউর রহমান কিংবা এরশাদের আমলের ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ ভোটের সঙ্গে তুলনা করছেন। অর্থাৎ ওই সময়ে সামরিক শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতাকে বৈধ করার লক্ষ্যে গণভোট দিয়েছিলেন। এবারের গণভোটকেও কেউ কেউ অর্ন্তবর্তি সরকারের প্রধানের পক্ষে বৈধতা দেবার ভোট হিসাবে মনে করছেন। ফলে গণভোটের বিপদটা এখানেই। কেউ কেউ আবার মনে করছেন, গণভোটের নামে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা হতে পারে। এসব বিষয়ে বিএনপি কিংবা জামায়াতের মতো বড় দলগুলো খুব বেশি মুখ খুলছে না। তারা গণভোটের চেয়ে নিজেদের নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। ফলে অর্ন্তবর্তি সরকারের প্রচার মানুষের কাছে মোটেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।

আগামী নির্বাচনে বিএনপি’র বিপুল বিজয়ের সম্ভাবনা দেখা গেলেও কিছু ঝুঁকির দিকও রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি’তে ৯১টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় এটা বিএনপি’র জন্যে খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়। জামায়াতে ইসলামী ধর্মীয় বিষয়কে ভোটের প্রচারে খুব বেশি করে সামনে আনছে। কেউ কেউ এটাও বলছেন যে, দাড়িপাল্লায় ভোট দিলে পরকালে জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম হবে। নির্বাচন একটি ইহ জাগতিক বিষয়। এখানে পরকালের বিষয় টেনে আনায় শিক্ষিত সমাজ জামায়াতের সমালোচনা করছেন। যদিও এই প্রচারের মাধ্যমে অনেককে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী অবশ্য বলছে, জান্নাতের টিকিট দেবার কথা তাদের দলের যারা বলছেন সেটা তাদের ব্যক্তিগত কথা। জামায়াতে ইসলামী দলীয়ভাবে এই বক্তব্যকে সমর্থন করে না। তারেক রহমান অবশ্য জামায়াতে এমন প্রচারকে শিরক হিসাবে অভিহিত করছেন।