জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্মহার ব্যাপক বাড়ছে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৮:৩৭ এএম, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ সোমবার
- দেশব্যাপী বিশেষজ্ঞ দলের গবেষণা কার্যক্রম চলমান
- খাদ্যে ভেজাল, পরিবেশ দূষণ, পানিতে মাত্রারিক্ত আর্সেনিক অন্যতম কারণ
দেশে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্মের হার ব্যাপকহারে বেড়ে চলছে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বড় ধরনের গবেষণা কার্যক্রম চলমান। গবেষণার প্রায় ৭০ ভাগ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শেষ হলে এ গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হবে। এ পর্যন্ত গবেষণার কার্যক্রমে জন্মগত ত্রুটি ও জটিল রোগ নিয়ে যেসব কারণে শিশুরা জন্মগ্রহণ করেছে, সেসব কারণ বিশেষজ্ঞ দলটি চিহ্নিত করেছে বলে একজন বিশেষজ্ঞ জানান।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে বিপুলসংখ্যক শিশু চিকিত্সা নিতে আসছে। এ চিকিত্সা খুবই ব্যয়বহুল হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এই চিকিত্সা খরচ জোগান দেওয়া সম্ভব নয়।
শিশুর জন্মগত ত্রুটির কারণ : শিশু শল্যবিদ, গাইনি বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত একজন বিশেষজ্ঞ জানান, খাদ্যে ভেজাল, পরিবেশগত বিষয়, খাবারে ফলিক অ্যাসিডের পরিমাণ খুব কম কিংবা না থাকা এই সমস্যার একটি বড় কারণ। অন্যদিকে পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ খুবই বেশি। খুলনা অঞ্চলসহ ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় খাবার পানিতে আর্সেনিক উপস্থিতির মাত্রা অনেক। এছাড়া সবজি ও মাছে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার একটি বড় সমস্যা। এসব কেমিক্যাল ব্যবহার করলে দীর্ঘ সময় তরিতরকারি, মাছ কিংবা খাদ্যসামগ্রীর পচন ধরবে না, তরতাজা দেখাবে। গবেষক দলের একজন সদস্য বলেন, মনে হবে খাবারসামগ্রী কিছুক্ষণ আগে তৈরি করা হয়েছে। অনুসন্ধানে কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস আগে তৈরিকৃত খাদ্যসামগ্রীর সন্ধান পাওয়া গেছে। অথচ এসব খাদ্যসামগ্রী সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি করার কথা। কিন্তু তারা অতি মুনাফার জন্য মাসের পর মাস রেখে বিক্রি করে আসছে। এছাড়া বিষাক্ত কেমিক্যাল কিংবা রং সংমিশ্রণে খাদ্যসামগ্রী তৈরি করা হচ্ছে। লাশ তাজা রাখার ফরমালিনও খাদ্যসামগ্রীতে ব্যবহার করা হয়। ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ কিংবা অলিগলি ও পাড়া-মহল্লা অথবা গ্রামাঞ্চলের ছোট ছোট কারখানায় এসব বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহূত হচ্ছে। গবেষক দল সরেজমিনে অনুসন্ধানে এ প্রমাণ পেয়েছে।
এসব বিষাক্ত খাদ্যসামগ্রী ও ফল, তরকারি গর্ভবতী মায়ের খাওয়ার কারণে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশু ভূমিষ্ঠ হচ্ছে। শুধু শিশুরা নয়, এসব বিষাক্ত খাদ্যসামগ্রী পরিবেশগত কারণে সব বয়সের নারী-পুরুষ জটিল রোগে আক্রান্তের হার বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানিয়েছেন।
বিএসটিআইসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থা বাজারজাতকৃত কিংবা তৈরি কারখানায় অনেক সময় মোবাইল কোর্ট করে জেল-জরিমানা করছে। এই অভিযান চলমান বলে বিএসটিআইয়ের একজন কর্মকর্তা জানান। তিনি বলেন, মুনাফালোভীদের দমন করা খুব কঠিন। ভেজাল খাদ্যসামগ্রীতে বাজার সয়লাব হয়ে আছে। এসব কারণে কিডনি কিংবা লিভার ক্যানসারে মা ও শিশু উভয়েরই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। দেশে অসংক্রামক রোগী আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধির এটি অন্যতম কারণ। ভেজাল ও বিষাক্ত কেমিক্যাল সংমিশ্রণে খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের বিকল্প নেই।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগ মাত্র ১৩ বেড নিয়ে শুরু হয় ১৯৯৩ সালে। বর্তমানে শিশু বিভাগ ৭৬ বেডে উন্নীত হয়েছে। হাসপাতালের নিউনেটাল সার্জারি বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আবদুল হানিফ টাবলু বলেন, জন্মগত বিভিন্ন ত্রুটি নিয়ে অনেক ভর্তি হচ্ছে। বিছানা দেওয়া সম্ভব হয় না, তারপরও তাদের ভর্তি করে অপারেশন করতে হয়। অনেকের পায়খানা রাস্তা নেই। অপারেশন করে পায়খানার রাস্তা করতে হয়। প্রস্রাবের ও স্পাইনালকর্ডসহ নানা ধরনের জটিলতা নিয়ে শিশুরা ভর্তি হয়। এই অপারেশন ব্যয়বহুল। এ হাসপাতালে এসব সমস্যার বিনা মূল্যে চিকিত্সা করা হয়ে থাকে। এ অভিজ্ঞ শিশু শল্যবিদের মতে, খাদ্যে ভেজাল ও পরিবেশগতসহ বিভিন্ন কারণে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশুরা জন্মাচ্ছে। এই হার বেড়ে চলেছে। খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল প্রতিরোধ করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগে ৯টি ইউনিট রয়েছে, ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে। ছোটখাটো অপারেশন করে এ সেন্টারে রেখে ঐদিন ছেড়ে দেওয়া হয়। জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করা হয়ে থাকে। সমন্বিত উদ্যোগের কারণে ঐ বিভাগে শিশুরা সুচিকিত্সা পেয়ে আসছেন বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েও জন্মগত ত্রুটি নিয়ে প্রচুর শিশু ভর্তি হচ্ছে। এখানেও বিছানা পাওয়া অনেক কঠিন। এই প্রতিষ্ঠানের শিশু শল্যবিদরা এসব সমস্যার উন্নতমানের অপারেশন করে শিশুদের সুস্থ করে তুলছেন।
ঢাকা শিশু হাসপাতাল পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগেও জন্মগত ত্রুটি নিয়ে আসা শিশুদের ভিড় দেখা যায়। প্রতিদিন এই হাসপাতালে শিশু শল্যবিদগণ বিরতিহীন অপারেশন করার পর অগণিত শিশু স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাচ্ছে। এই হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সফি আহমেদ মোয়াজ বলেন, জন্মগত হার্ট ছিদ্র, ঠোঁটকাটা, তালু কাটা, কানে কম শোনাসহ নানা ধরনের জন্মগত ত্রুটি নিয়ে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে অনেক শিশুকে অভিভাবকরা নিয়ে আসছেন। জেনেটিক, পরিবেশ ও খাদ্যে ভেজালের কারণে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্মের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিকার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি জানান। আগারগাঁও নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের যুগ্ম-পরিচালক ও নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, গবেষণায় প্রমাণিত যে, ভেজাল খাদ্যসামগ্রীর কারণে স্পাইনালকর্ডে ত্রুটি, ব্রেনের ত্রুটি, মাথা বড় হয়ে যাওয়া, ব্রেনের নানা ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জন্মের পর দেখা যায়, শিশুর মেরুদণ্ড বের হয়ে আসে। বিষাক্ত কেমিক্যাল সংমিশ্রণের খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ, আর্সেনিকের পরিমাণ বেশি থাকা পানি পান কিংবা ব্যবহার করা এবং খাবারে ফলিক অ্যাসিড কম থাকলে এ ধরনের জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশুর জন্ম হয় বেশি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও গাইনি বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা বলেন, খাদ্যে ভেজাল, পরিবেশ, বায়ুদূষণ ও পুষ্টিহীনতাসহ বিভিন্ন কারণে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্মের হার বাড়ছে। প্রতিকার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি জানান।
