ভোটের লড়াই ডিজিটাল মাঠে
সাপ্তাহিক আজকাল
প্রকাশিত : ০৮:৩১ এএম, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ সোমবার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১৬ দিন। এবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিধিনিষেধের কারণে দেয়ালে দেয়ালে নেই পোস্টার; নেই মাইকের গগনভেদি শব্দ। ডিজিটাল অ্যালগরিদমে চলছে ভোটের প্রচার। পোস্টার আর মাইকের স্থান দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন। মাঠের প্রচারের চেয়েও বড় লড়াইয়ের ময়দান এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির বার্তা, ভিডিওতে ছেয়ে গেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হচ্ছে নির্বাচনী গান, শর্ট ভিডিও ও গ্রাফিক কনটেন্ট। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া বক্তব্য, বিকৃত ভিডিও ও বিদ্বেষমূলক কনটেন্টও কম নয়, যা বাড়িয়ে তুলছে রাজনৈতিক উত্তেজনা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নির্বাচনী পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে প্রভাবিত করতেই কনটেন্ট বেশি তৈরি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অনেকেই প্রচারের জন্য ডিজিটাল টিম গঠন করেছেন। ফেসবুক বুস্টিং, ইউটিউব বিজ্ঞাপন, টিকটক ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ে তথা অনলাইন প্রচারণায় ঢালা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি তানভীর হাসান জোহা আমাদের সময়কে বলেন, ডিজিটাল প্রচারণা দ্রুত ও লক্ষ্যভিত্তিক যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়। ফলে ভোটের প্রচারে সামাজিক মাধ্যম রণক্ষেত্রে রূপ নিচ্ছে। সমাধান হিসেবে ভেরিফায়েড অ্যাড লাইব্রেরি, রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক করা দরকার। একই সঙ্গে ভুয়া কনটেন্ট দমনে দ্রুত টেকডাউন ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো জরুরি। এআই ও ডিপফেক শনাক্তে এআই-ভিত্তিক ডিটেকশন টুল, ওয়াটারমার্কিং ও সোর্স অথেনটিকেশন কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত ফ্যাক্ট-চেকিং ও আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটাল মার্কেটিং বিশ্লেষকরা বলছেন, তরুণ ভোটারদের টার্গেট
করে তৈরি ভিডিওগুলোতে আবেগ, ট্রেন্ডিং মিউজিক ও নাটকীয় উপস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক দলের প্রচারণাতেও তরুণদের আকৃষ্ট করতে ট্রেন্ডিং মিউজিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব নির্বাচনীয় গানের সঙ্গে নাচ বা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিসহ তৈরি হচ্ছে টিকটক ভিডিও। মুহূর্তে তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ছে।
ফার্মগেটের ব্যবসায়ী লিয়াকত হোসেন বলেন, ফেসবুক খুললেই নির্বাচনীয় গান আর প্রচার সামনে আসে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে এসব প্রচার চালানো হয়। এমনটা করবে না কেন? আমার কাজের মহিলার হাতেও স্মার্টফোন আছে। ফেসবুক-ইউটিউব চালায়। চোখের সামনে বারবার একজন প্রার্থীর প্রচার ভেসে এলে তার প্রতি একটা আগ্রহ তৈরি হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনীয় প্রচারণার বিভিন্ন বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট সাধারণ মানুষের কাছে সত্য হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। ফলে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, বাড়ছে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সামাজিক বিভাজন।
নির্বাচনী প্রচারে প্রার্থী বা দলের ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষকে অস্বস্তিকর বলেও মনে করছেন সামাজিক মাধ্যমের অনেক ব্যবহারকারী। ঢাকার বাড্ডায় বসবাসকারী স্কুলশিক্ষক আব্দুল গফুর খান গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, ফেসবুক খুললেই দেখি পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ। রবিবার সকালে ফেসবুকে দেখলাম ভোট চাইতে যাওয়া এক নারীকে চোখ তুলে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। সামাজিক মাধ্যমকে মনে হয় যুদ্ধক্ষেত্র। বন্ধ করে দিতে চাই মাঝেমধ্যে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত করা হয় না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন তরুণ ভোটাররা। টিকটক, রিলস ও শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মে তরুণদের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় দলগুলো সেখানেই সর্বাধিক বিনিয়োগ করছে। সহজ ভাষা, সেøাগানধর্মী বার্তা ও আকর্ষণীয় ভিজ্যুয়াল দিয়ে তরুণদের আবেগে নাড়া দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম বলেন, রাজনীতি ছিল আগে হাটে-মাঠে-ঘাটে। গ্রামের বাড়িতে প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্পে চায়ের কাপে জমে উঠতো রাজনীতি। এখন রাজনীতি নিউজফিডেই বেশি দেখি। কে কী বলছে, সেটা অনেক সময় যাচাই করার সুযোগ পর্যন্ত থাকে না।
সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবি দেখে অবিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর নিজের মতের সঙ্গে মিললেই এসব ভিডিও শেয়ার করছে মানুষ। মুর্হূতে নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে উদ্ধৃত করে ‘গণভোটে কেহ না ভোট দিলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে ফাঁসি দেওয়া হবে।’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ফ্যাক্ট চেকে দেখ যায়, ফটোকার্ডটি ভুয়া।
দেশে প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার। একাধিক দল ও সংসদ সদস্য প্রার্থীর ডিজিটাল প্রচার সেলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিজিটাল মাধ্যমে তরুণদের টার্গেট করে বিভিন্ন গান ও ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে তাদের নির্বাচনী গান ও বক্তব্য প্রচার করছে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট আসনের ভোটারদের টার্গেট করে ফেসবুক ও ইউটিউবে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিসহ প্রচার চালানো হচ্ছে। জামায়াতের ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে নেতারা বলছেন, যেসব অঞ্চলে তাদের অবস্থান ভালো, সেসব অঞ্চলকে টার্গেট করে ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে তারা খুলনা বিভাগ, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলকে টার্গেট করে প্রচার চালাচ্ছেন।
তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া অডিও কিংবা ফটোকার্ড সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা অসম্ভব। এতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভ্রান্তির শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশে এআইনির্ভর অপপ্রচার ঠেকাতে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এটি বেশি ঘটছে। এ পর্যায়ে জাতীয়ভাবে একটি ডিজিটাল ফ্যাক্ট চেকিং ফ্রেমওয়ার্ক, সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং আইনগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যেভাবে নানামুখী অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা মোকাবিলাই এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এখন এআই যুগে। শুরু থেকেই আমি বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে আসছি।
ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও গুজব প্রতিরোধে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ)। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ বলছে, সামাজিক মাধ্যমকেন্দ্রিক ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণে ৩৪ জন বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি বিশেষ টিম কাজ করছে। সার্বক্ষণিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো প্রোপাগান্ডা পর্যবেক্ষণ, যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতির ছোট ভিডিও ও গ্রাফিক কার্ড উপস্থাপন করছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘ফার্মার কার্ড’। তবে জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় ভারতবিরোধী বার্তাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ কোটি। এটি দেশের আনুমানিক ১৭ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ। ডেটা রিপোর্টাল নামের এক বৈশ্বিক ডিজিটাল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী, প্রায় ৫ কোটি ইউটিউব ব্যবহারকারী এবং প্রায় ৯২ লাখ ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী আছে। এ ছাড়া ১৮ বছরের বেশি বয়সী ৫ কোটি ৬০ লাখের বেশি টিকটক ব্যবহারকারী রয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। এই তরুণদের বেশির ভাগই প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক দলগুলো ভোটকে সামনে রেখে তাদের ‘থিম সং’ বানিয়েছে। বিএনপির থিম সং-এর মূল ফোকাস রাখা হয়েছে দলের প্রতীক ‘ধানের শীষে।’ জামায়াতে ইসলামীর থিম সং-এ ফোকাস রাখা হয়েছে তাদের দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লাকে।’ একইভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) তাদের থিম সং-এ প্রাধান্য দিয়েছে দলীয় প্রতীক ‘শাপলা কলি’কে।
বিএনপি তাদের দলের প্রচারে গান প্রকাশ করেছে। গানের কথায় বলা হয়, ‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ, ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ।’ জামায়াতের নির্বাচনী গান ‘নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল দেখা শেষ, দাঁড়িপাল্লা এবার গড়বে বাংলাদেশ।’
সম্প্রতি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এক গবেষণায় দেখিয়েছে, অ্যালগরিদমের সহায়তা নিয়ে কোটি কোটি মানুষকে প্রভাবিত করা যায় এবং নির্বাচনের ফলাফল নিজের পক্ষে নেওয়া সম্ভব হয়। ২০২৪-২৫ সালের এক গবেষণায় স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরা দেখিয়েছেন, ভোটাররা সত্যের চেয়ে নিজের দলের পছন্দকে বেশি গুরুত্ব দেন। এমনকি তথ্য ভুল হলেও তা যদি নিজের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে যায়। মানুষ তা বিশ্বাস করতে দ্বিধা করে না। আর এ বিষয়টি আমলে নিয়েই রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের পক্ষে ভোটার টানার লক্ষ্যে কাজ করে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, ডিজিটাল প্রচারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠলেও মাঠের প্রচার এখনও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাঠের প্রচারণায় যারা বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারবে, তাদের প্রতিই ঝুঁকবেন ভোটাররা।
